সিলেট সিটি কর্পোরেশন
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া জন্মসনদ তৈরিতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জালিয়াতির এই ঘটনায় দায়ী এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন।
বিদেশ গমন, ভিসা প্রসেসিংসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় জন্মসনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সম্প্রতি ব্রিটিশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে সিসিকের অঞ্চল-০৬ থেকে ইস্যু করা ১১টি জন্মসনদ ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
এই ঘটনায় সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম ও সহকারী নিবন্ধক নজরুল ইসলামকে দায়ী করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে এই দুই কর্মকর্তার প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিলেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে সিসিক। তিন কার্যদিবসের মধ্যে ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় ১১টি জন্মনিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় সহকারী নিবন্ধককে বদলি করা হলেও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। তবে কীভাবে তদন্ত হয়েছিল, তা জানতে থেকে সিসিকের ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে না গিয়েই শুধুমাত্র কাগজের ওপর ভিত্তি করে তারা তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন।
অন্যদিকে তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য ও স্বাস্থ্য শাখার ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. নাসিম মিয়া জানান ভিন্ন কথা।
তিনি বলেন, আনোয়ারুল হককে সাথে নিয়েই তারা সরেজমিনে তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দিয়েছেন। তদন্ত কমিটির দুই সদস্যের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
এতগুলো জাল সনদ কীভাবে দেয়া হলো, সে বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, এই ঘটনায় কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তিনি জালিয়াতির জন্য ‘অদৃশ্য কারণ’কে দায়ী করেন।
এর আগে চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে সিসিককে একটি চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে জন্মসনদ ইস্যুর ঘটনায় নিবন্ধন সহকারী ও মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
এ বিষয়ে সিসিক প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত আছেন কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঘটনাটিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার কর্মী লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, তদন্তে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও একজনকে বদলি করে অন্যজনকে একই পদে বহাল রাখায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির একজন সদস্য জানান, জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ নেই। যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুয়া জন্মসনদ তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও বৈধ জন্মসনদ পেতে তাদের দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হয়। অথচ জাল তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া জন্মসনদ ইস্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিসিকের নিবন্ধন বিভাগে প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ থেকে ৩০০টি জন্মনিবন্ধনের আবেদন জমা পড়ে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতে জালিয়াতির অভিযোগ জনসাধারণের আস্থাকে বড় ধরনের সংকটের মুখে ফেলেছে।