লন্ডন : রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬ ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই সমালোচনার মুখে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম

যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।

যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।


প্রকাশ: ১১/০৭/২০২৬ ০১:৪৪:০০ অপরাহ্ন

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। 

তিনি বলেছেন, গাজায় রক্তপাতের ঘটনায় আগের লেবার সরকার যথাসময়ে কড়া অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ক্ষমতায় এসে তার সরকার এ বিষয়ে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।

বার্নহ্যামের এই মন্তব্যের পর যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী ইহুদি সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টিও তার অবস্থানের সমালোচনা করেছে। তবে লেবার পার্টির বামপন্থী এমপিরা তার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন।

সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকার গাজা সংকট যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি।

তিনি বলেন, আমরা গাজা ইস্যুতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতেও আমরা অনেক দেরি করেছি।

তিনি আরও জানান, ক্ষমতায় গ্রহণের পর তার সরকার গাজায় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করবে। 

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।

বার্নহ্যাম একই সঙ্গে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিলেও যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে না।

তিনি ন্যাটোর প্রতি অঙ্গীকার, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

যুক্তরাজ্যের বোর্ড অব ডেপুটিজ অব ব্রিটিশ জিউজ এবং জিউইশ লিডারশিপ কাউন্সিল এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, বার্নহ্যামের বক্তব্য নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন এবং এ বিষয়ে তার দলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছে।

তারা বলেছে, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বার্নহ্যামের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতিকে তারা স্বাগত জানায়। একই সঙ্গে গাজার মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগও তারা ভাগ করে নেয়।

তবে সংগঠনগুলোর মতে, ইসরায়েল সরকারের সমালোচনার আড়ালে অনেক সময় চরমপন্থি ইসলামপন্থি, অতি-বাম ও অতি-ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে থাকে। তাই ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেম প্রীতি প্যাটেল অভিযোগ করেন, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারবেন না।

তার ভাষায়, একদিকে তিনি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা বলছেন, অন্যদিকে নিজের দলের বামপন্থি অংশ ও ফিলিস্তিনপন্থি সমর্থকদের সন্তুষ্ট করতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।

অন্যদিকে কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরাইলের পার্লামেন্টারি চেয়ারম্যান গ্রেগ স্মিথ বলেন, যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষুণ্ন করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে।

বার্নহ্যামের ঘোষণাকে লেবার পার্টির বামপন্থি এমপিরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

সাবেক ছায়ামন্ত্রী ক্লাইভ লুইস বলেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় প্রথম পদক্ষেপ। তিনি ইসরাইলের ওপর সম্পূর্ণ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার আহ্বান জানান।

আরেক সাবেক ছায়ামন্ত্রী অ্যান্ডি ম্যাকডোনাল্ডও বার্নহ্যামের অবস্থানকে ‘সঠিক ও বড় পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন।

যুক্তরাজ্যের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেমস মারেও স্বীকার করেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে ব্রিটিশ সরকার দেরি করেছিল।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়, আমরা যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিলাম, তা আরও অনেক আগেই জানানো উচিত ছিল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের ব্যাপক সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উভয় পক্ষই তা লঙ্ঘনের অভিযোগে একে অপরকে দায়ী করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ শান্তি দূত নিকোলাই ম্লাদেনভও বলেছেন, হামাস ও ইসরাইল- উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

উভয় পক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত নয় মাসে গাজায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন, এবং চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন।

কিয়ার স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইতোমধ্যে ৩২২ জন লেবার এমপির সমর্থন পেয়েছেন। ফলে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ভোট ছাড়াই তিনি লেবার পার্টির নেতা এবং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।

বার্নহ্যাম ইতোমধ্যে ব্রিটেনের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করা, গণপরিবহন, আবাসন ও প্রয়োজনীয় সেবার ওপর স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।

এছাড়া প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে কর বৃদ্ধি অথবা সরকারি ঋণ বাড়ানোর সম্ভাবনাও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা উড়িয়ে দেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা নীতিতে কঠোর অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বার্নহ্যাম লেবার পার্টিকে নতুন রাজনৈতিক পথে এগিয়ে নিতে চাইছেন। তবে তার এই অবস্থান যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে নতুন বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন