হযরত শাহজালাল (র:) এর দরগাহের ঐতিহাসিক ডেগ
বিএনপি নেতা কাইয়ুম, আরিফ, কয়েস লোদী, মুক্তাদির—কে চালাচ্ছেন সিলেট? কার আদেশে ডিসি আসছেন, প্রত্যাহার হচ্ছেন, নতুন ডিসি আসছেন? আবার পর্দার আড়ালে কারা আছেন—আওয়ামী লীগ, জামায়াত, জমিয়ত, মজলিশ নাকি ফুলতলী—তা বলা দুষ্কর।
গত চার দিনে দরগাহের ঐতিহাসিক ডেগ থেকে উঠেছে প্রায় সাড়ে সতেরো লক্ষ টাকা। এর বাইরে রয়েছে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, সোনাদানা এবং বৈদেশিক মুদ্রা। **এক অলৌকিক রত্ন ভান্ডার**। তবে ডিসির স্থাপিত সরকারি দানবাক্স নাকি প্রায় খালিই রয়েছে। মানুষ সরকারি দানবাক্সে অর্থ দিতে আগ্রহী নয়।
সিলেটের মানুষ নিজেরা খুব বেশি দরগাহে দান করেন না। দানের বড় অংশ আসে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত ভক্তদের কাছ থেকে। দানের অর্থের স্বচ্ছ হিসাব থাকলে সেটি অবশ্যই ভালো। আমরাও চাই, এই অর্থ গঠনমূলক ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হোক। তবে সেই কাজটি হতে হবে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে এবং সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে।
কিন্তু অতিউৎসাহী জেলা প্রশাসক বিষয়টি যেভাবে পরিচালনা করেছেন, তা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। মানুষ শাহজালাল (র.)-এর মাজারের ডেগে দান করে। সেই দানের একটি বড় অংশ খাদেমদের কাছে যায়—এটি নতুন কিছু নয়। **যারা দান করে, তারা কখনোই এর হিসাব চায় নি, চাইবেও না**। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খাদেম পরিবারগুলো এই ব্যবস্থার অংশ। যারা দান করেন, তারাও জানেন যে এই অর্থ সরাসরি শাহজালাল (র.)-এর কাছে পৌঁছায় না; খাদেমদের কাছে যায় এবং মাজার পরিচালনার বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়।
তবে এটাও সত্য যে সব অর্থ ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয় না। মাজার পরিচালনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, তবারক, শিন্নি, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রমের ব্যয়ও এই অর্থ থেকেই নির্বাহ করা হয়।
শাহজালাল (র.)-এর মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যৌক্তিক অধিকার সরকারের অবশ্যই আছে। কিন্তু বিষয়টি বাস্তবায়নের পদ্ধতি আরও পরিমিত, পরামর্শভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক হতে পারত। শত শত বছরের পুরোনো পিতলের ডেগ সিলগালা করা, সেখানে সিসি ক্যামেরা বসানো এবং পাশাপাশি একটি বিশাল সরকারি দানবাক্স স্থাপন—এসব পদক্ষেপকে অনেকে স্থানীয় আবেগ-অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতার অভাব হিসেবে দেখছেন।
সমাধান আরও সুন্দর হতে পারত। সাতশ বছরের বেশি সময় ধরে যে খাদেম পরিবারগুলো এই নগরের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের অংশ, তাদের সম্মান ও ঐতিহ্যকে বিবেচনায় নেওয়া যেত। একই সঙ্গে সিলেটের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে একটি সর্বসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত যে, এখন থেকে মাজারের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা হবে।
কারণ একজন মানুষ যখন ‘শাহজালালের ডেগে’ দান করেন, তখন তিনি শুধু অর্থ দান করেন না; তিনি একটি ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও আবেগের অংশীদার হন। সেই মানুষটি ডেগে দান করতে আগ্রহী, কিন্তু সরকারি দপ্তরের কোনো স্টিলের দানবাক্সে কখনোই দান করবেন না।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, জেলার আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসক কেন মাজারের বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দিলেন। এছাড়া কেউ কেউ মনে করেন, প্রশাসনিক কার্যবিধি (Rules of Business) অনুযায়ী বিষয়টি সরাসরি জেলা প্রশাসকের দায়িত্বের আওতায় পড়ে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়।
দরগাহ, মান্নত ও ধর্মীয় অনুদান অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এগুলো কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে পরিবর্তন করা যায় না। পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বোঝাতে হয়, সম্পৃক্ত করতে হয় এবং আস্থা অর্জন করতে হয়। যারা কখনো দরগাহে দান করেননি, করবেনও না, বিশ্বাসও করেন না, তারা যদি হঠাৎ করে হিসাবের একমাত্র দাবিদার হয়ে দাঁড়ান, টাকা গুনতে শুরু করেন, তাহলে সেই সমীকরণ বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না।
দরগাহের বর্তমান দৃশ্যমান উন্নয়নের বড় অংশই মরহুম এম. সাইফুর রহমানের উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। তবে তিনিও একসময় আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, দরগাহের অধিকাংশ উন্নয়ন সরকারি অর্থে করা হলেও দরগাহ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি কোন আর্থিক সহযোগিতা পাননি।
ঐতিহাসিকভাবে সিলেটের ৩৬০ আউলিয়ার মাজার লাখেরাজ বা করমুক্ত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বা ট্রাস্টভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে আসছে। পাঠান, মুঘল, বৃটিশ, পাকিস্তান, কোন আমলেই সরকার দরগাহ কর্তৃপক্ষ থেকে কোনও টাকা নেয়নি, আবার কোন উন্নয়নও করে নি।
জেলা প্রশাসক আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন যে, দরগাহ উন্নয়ন প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশন নাকি দরগাহের পক্ষ থেকে ৫ কোটি টাকা অংশগ্রহণমূলক অর্থায়নের কথা বলেছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের। পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ভূমিকা পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায়। তারা অর্থ যোগাড়ের আদেশ দিতে পারে না।
অনেকের মত হলো, যদি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে দানের অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে দরগাহকেন্দ্রিক একটি বিশ্বমানের ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, (Islamic Research Institute), গ্রন্থাগার বা জ্ঞানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যা সিলেট ও দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর হবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষ এ টাকা সিলেটের বিভাগীয় উন্নয়নের জন্য দান করে না। This donation is Dargah related only.
এই অর্থের অন্তত ৯০% যেন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম, দ্বীনি শিক্ষা, মাজার ক্যাম্পাসের উন্নয়ন, সেবামূলক উদ্যোগ এবং অন্যান্য **সাদাকায়ে জারিয়া**মূলক কাজে ব্যয় হয়—এটাই প্রত্যাশিত। অবশিষ্ট সর্বোচ্চ ১০% অংশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত খাদেম ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের যৌক্তিক সম্মানী ও পরিচালন ব্যয়ের জন্য রাখা যেতে পারে।
মাজারে দানকৃত অর্থকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সম্পদ হিসেবে দেখার ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এটি মূলত মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দানের আমানত—যার সঠিক ব্যবহার সমাজের কল্যাণে হওয়া উচিত।
যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, তাই সকল অংশীদার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনা অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন ও স্বীকৃত অডিট ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে, যাতে দানের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
এ ধরনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি কোনোভাবেই শাহ জালাল (রহ.)-এর বিরোধিতা নয়, কিংবা তাঁর প্রতি কোনো ধরনের অশ্রদ্ধাও নয়। বরং তাঁর শিক্ষা, মানবকল্যাণ ও সেবার আদর্শকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি দায়িত্বশীল প্রচেষ্টা হিসেবে বিষয়টিকে দেখা উচিত। তাই এসব যৌক্তিক দাবি বা সংস্কারের আহ্বানকে ভুলভাবে “বিরোধিতা” বা নেতিবাচক ট্যাগ দেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে সংকলিত।