মরক্কোর ‘তারেক বিন জিয়াদ মসজিদ’
আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় মরক্কোর শেফশাউন প্রদেশে অবস্থিত ‘তারেক বিন জিয়াদ মসজিদ’।
শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলাম প্রচারের ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু মরক্কোর শেফশাউন প্রদেশের শারাফাত গ্রামে অবস্থিত তারেক বিন জিয়াদ মসজিদ।
তৎকালীন টাঙ্গিয়ারের গভর্নর ও প্রখ্যাত মুসলিম সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ ৮৫ হিজরি তথা ৭০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।
মরক্কোর পাহাড়ঘেরা শারাফাত গ্রামের নীরব প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক জীবন্ত ইতিহাস।
এটি শুধু একটি মসজিদ নয়; বরং ইসলাম প্রচার, জ্ঞানচর্চা, দাওয়াহ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল সাক্ষী। প্রায় তেরো শতাব্দী আগে প্রখ্যাত মুসলিম বিজেতা ও আন্দালুস জয়ের নায়ক তারেক বিন জিয়াদের হাতে নির্মিত এই মসজিদ আজও মরক্কোর ইসলামী ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।
শুধু ইবাদতের স্থান হিসেবেই নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মসজিদ ছিল ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার এক প্রধান কেন্দ্র। এর সংলগ্ন মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য আলেম, গবেষক, ফকিহ ও দায়ী বের হয়েছেন, যারা পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই মসজিদ শুধু শিক্ষার আলোই ছড়ায়নি, বরং স্প্যানিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে মরক্কোর স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯২০-এর দশকে স্থানীয় স্বাধীনতাকামী মুজাহিদরা এই মসজিদের আঙিনায় বসে স্প্যানিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতেন। এখান থেকেই পরিচালিত হয়েছিল ঐতিহাসিক আল কুল্লা যুদ্ধ, যেখানে ঔপনিবেশিক বাহিনী বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিল।
শা রাফাত অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির জায়গা হিসেবে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক মসজিদ ও ধর্মীয়-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মরক্কোর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মসজিদ স্বয়ং সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদের হাতে নির্মিত হয়েছিল।
শেফশাউনের শারাফাত এলাকাটি কৌশলগতভাবে রিফ পর্বতমাালার দুটি পাহাড়ের মাঝে একটি প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এটি সামরিক কমান্ডার তারেক বিন জিয়াদের সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান সমাবেশস্থলে পরিণত হয়েছিল।
শরাফাতের এই সেনাশিবিরে অবস্থানকালে সৈন্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিপুল সংখ্যা এবং তাদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর মসজিদের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে তারেক বিন জিয়াদ নিজের সৈন্য ও স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে নিয়ে এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
স্পেন বা আন্দালুস বিজয়ের পাশাপাশি উত্তর মরক্কোয় ইসলাম প্রচারে অসামান্য অবদান রাখা এই বীর সেনাপতিকে মুসা বিন নুসাইর টাঙ্গিয়ারের আশেপাশের ঘুমারা ও বারঘাওয়াতা বার্বার উপজাতিদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
একইভাবে শরাফাত অঞ্চলের মানুষও কমান্ডার তারেক বিন জিয়াদের এই অবদানের প্রতিদান দিয়েছিলেন। আন্দালুসিয়ান শিক্ষা ও পাঠ্য সংশোধন বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মিফতাহ উল্লেখ করেছেন, স্থানীয় অধিবাসীরা এই কমান্ডারের সাথে তার বিভিন্ন ইসলামিক বিজয়ে অংশ নিয়েছিলেন।