লন্ডন : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ন

ক্ষমতা হারাচ্ছেন ট্রাম্প?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প


প্রকাশ: ২৯/১০/২০২৬ ০৮:৫৭:৪৬ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের ভোট নয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার ভবিষ্যৎও এর সঙ্গে জড়িত। 

নির্বাচনে কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হতে পারে।

আগামী ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচিত করবেন ভোটাররা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আইনপ্রণেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন বা Midterm Election। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। বরং কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্যদের নির্বাচিত করেন ভোটাররা।

কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকা দল সরকারের নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী, এসব নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ দশমিক ৫টি আসন হারিয়েছে। সিনেটেও সাধারণত আসন কমেছে।

তাই এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি আসন হারালে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হলো প্রতিনিধি পরিষদ। এর মোট আসন ৪৩৫টি। প্রতিটি আসনের জন্য একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং তাদের মেয়াদ দুই বছর।

প্রতি দুই বছর পর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে নির্বাচন হয়। কোনো দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হয়।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি আসন রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের আসন ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া দুটি আসন শূন্য রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে তাদের আসনসংখ্যা বাড়াতে হবে। অল্প কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফলও এ ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রায় ৩৫টি আসনের লড়াই প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় ও আইন প্রণয়ন নিয়ে রিপাবলিকানদের ওপর চাপ বাড়াতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট। এর সদস্যসংখ্যা ১০০। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাদের মেয়াদ ছয় বছর।

প্রতি দুই বছর পর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবারের নির্বাচনে নিয়মিত ৩৩টি আসনের পাশাপাশি ফ্লোরিডা ও ওহাইওতে দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা দুজন স্বতন্ত্র সদস্যসহ তাদের পক্ষে রয়েছেন মোট ৪৭ জন।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১টি আসনে পৌঁছাতে হবে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা ৫০টি আসন ধরে রাখতে পারলেও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সমতা ভাঙার ভোটের কারণে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন।

সিনেটের দায়িত্ব শুধু আইন অনুমোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রেসিডেন্টের মনোনীত মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনেও সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তাই সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের নতুন নিয়োগ এবং বিচার বিভাগসংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় অন্যতম প্রধান ইস্যু। জ্বালানি, বাড়িভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ভোটারদের মধ্যে।

এ ছাড়া অভিবাসননীতি, প্রজনন অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবস্থা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব বিষয় জাতীয় নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা এসব ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে পারেন। এর প্রভাব পড়তে পারে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোটের হিসাবে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইউএসএফ্যাক্টসের হিসাবে, দেশটির ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের প্রায় পাঁচজনের মধ্যে চারজন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত।

ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ। এরপর রয়েছে টেক্সাস ও ফ্লোরিডা।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার তাদের নির্বাচনি এলাকায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করছেন। রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ। অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেন পাঁচ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্ত নেননি।

জরিপে নারীদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। পুরুষ ভোটারদের মধ্যে দুই দলের সমর্থন ছিল সমান।

তবে জরিপের ফলই চূড়ান্ত নির্বাচনি ফল নির্ধারণ করে না। ভোটার উপস্থিতি, স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নির্বাচনি এলাকার পরিস্থিতিও ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন পাস করা কঠিন হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কার্যক্রম তদন্ত করতে পারবেন। সরকারি ব্যয়ের বিল নিয়েও বিরোধ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আইন পাস করতে সাধারণত কংগ্রেসের উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। তাই প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে রিপাবলিকানদের এককভাবে আইন পাস করার সুযোগ থাকবে না।

সরকারি ব্যয় নিয়ে বিরোধ বাড়লে ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়ন আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন না মিললে সরকারের কিছু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এ পরিস্থিতিকে বলা হয় সরকারি শাটডাউন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটেরও নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিভিন্ন পদে নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার এবং অভিশংসনের প্রস্তাব আনার ক্ষমতা পাবেন। তবে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া আর প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়।

প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সিনেটে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

এ কারণে কংগ্রেসের একটি কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে, এমনটি বলা যায় না।

এমনকি ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকবেন। তিনি কংগ্রেসে পাস হওয়া বিলে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অগ্রাহ্য করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।

আগামী ৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় প্রথম ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর নির্বাচনের প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করবে। তবে সব আসনের চূড়ান্ত ফল একই রাতে পাওয়া না-ও যেতে পারে।

ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট, সাময়িক ব্যালট এবং বাকি থাকা ভোট গণনার কারণে কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফল প্রকাশে কয়েকদিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে।

কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে প্রাথমিক ফল এক দলকে এগিয়ে রাখলেও পরে বাকি ভোট গণনার পর ব্যবধান কমে যেতে পারে বা এগিয়ে থাকা প্রার্থী বদলে যেতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি আলোচনায় ‘রেড মিরাজ’ বলা হয়।

প্রাথমিক ফলের পরিবর্তন বা ভোট গণনায় বিলম্ব নিজে থেকেই নির্বাচনে জালিয়াতির প্রমাণ নয়।

শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে, ট্রাম্প প্রশাসন তার মেয়াদের বাকি সময়ে কতটা সহজে আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

আরও পড়ুন