আল-কারাউইয়িন মসজিদ, ফেজ, মরক্কো
আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় 'মরক্কোর আল-কারাউইয়িন মসজিদ'’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
আল-কারাউইয়িন মসজিদ মরক্কোর ফেজ শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলোর একটি। এটি কেবল একটি নামাজের স্থানই নয়, বরং ইসলামের ইতিহাস ও বিশ্বশিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবময় স্থান দখল করে আছে।
প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস
প্রতিষ্ঠাতা: ফাতিমা আল-ফিহরি নামের একজন উচ্চশিক্ষিত ও ধনী মুসলিম নারী ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পত্তি এই মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণে উৎসর্গ করেন।
নামকরণ: তিউনিসিয়ার 'কায়রাওয়ান শহর থেকে আসা অভিবাসীদের এলাকায় এটি নির্মিত হওয়ায় এর নাম রাখা হয় "আল-কারাউইয়িন"।
আল-কারাউইয়িন মসজিদ একটি বিশাল স্থাপনা, যার ভেতরেই রয়েছে বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়—যার ইতিহাস এমনকি সরবোন বা অক্সফোর্ডের চেয়েও সুপ্রাচীন।
এটি এতটাই বিশাল যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি যে ‘কারাউইন’ এলাকায় অবস্থিত, সেখানকার ঘরবাড়ি ও অলিগলির ভিড়ে তা আংশিক আড়ালেই থেকে গেছে; ফলে এর মূল সীমানা বা সামগ্রিক আয়তন একনজরে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।
একসাথে ২০,০০০ মানুষের নামাজ আদায়ের ধারণক্ষমতা-বিশিষ্ট আল-কারাউইন মসজিদটি যে স্থাপত্য-কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত, তা ৮৫৯ সালে তিউনিসীয় শরণার্থী ফাতিমা আল-ফিহরিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তিনি ছিলেন এক ধনী ব্যবসায়ীর কন্যা এবং নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ একটি মসজিদ নির্মাণে ব্যয় করার সংকল্প করেছিলেন। তবে কিছু ইতিহাসবিদ এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন; তাঁদের মতে, এই ধর্মীয় কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইদ্রিস দ্বিতীয়-এর এক পুত্র—যিনি সে সময় মরক্কোর এই অঞ্চল শাসন করছিলেন—এবং ফাতিমার কাহিনীটি সত্যের চেয়ে লোককথার পর্যায়েই বেশি পড়ে। যা-ই হোক, দ্বাদশ শতাব্দীতে আলমোরাভিদ শাসকরা এই কমপ্লেক্সটির সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আল-কারাউইনের স্বর্ণযুগ ছিল ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে; সে সময় এর পাঠ্যক্রম ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এর খ্যাতি ও মর্যাদা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল।
সেই সময়েই মারিনিদ রাজবংশ কারাউইন মূল ভবনের আশেপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেছিল, যার মধ্যে অন্যতম হলো ১৩২৩ থেকে ১৩২৫ সালের মধ্যে নির্মিত আল-আত্তারিন মাদ্রাসা।
এই ভবনগুলো মসজিদের আনুষঙ্গিক বা সহায়ক স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, আর মসজিদটি নিজেই ফেজ শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে ছিল।
এখানকার শিক্ষার্থীরা ছিল মূলত পুরুষ; তবে প্রচলিত আছে যে, ‘নারীদের জন্যও মাঝে মাঝে বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হতো—যেমন একটি বিশেষ গ্যালারি বা ‘রিওয়াক’-এ বসে তাঁরা বক্তৃতা শোনার সুযোগ পেতেন, যেখান থেকে পণ্ডিতদের আলোচনার আসরটিও দেখা যেত।’
