লন্ডন : রবিবার, ৩১ মে ২০২৬ ১০:৩৪ অপরাহ্ন

সিলেটে দুর্ভোগের কারণে ঈদেও পর্যটকের সংখ্যা কম

সিলেটে ঈদে জাফলং স্পটে পর্যটকদের একাংশ

সিলেটে ঈদে জাফলং স্পটে পর্যটকদের একাংশ


প্রকাশ: ৩১/০৫/২০২৬ ১০:৩০:০০ পূর্বাহ্ন

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ও নির্মাণকাজজনিত দুর্ভোগ, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব- সব মিলিয়ে সিলেটমুখী পর্যটনখাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী সিলেটে পর্যটকদের ঢল নামলেও এবার চিত্রটা ভিন্ন। হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে আগাম বুকিংয়ে পূর্ণ হওয়ার পরিবর্তে এ বছর উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে পর্যটকের উপস্থিতি। 

রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার ঈদে হোটেল-মোটেলে বুকিং অনেক কম। ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে সাধারণত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই সিলেটের অধিকাংশ আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টে অগ্রিম বুকিং শুরু হয়। কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই নেই। অনেক হোটেল এখনো খালি।

এদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘ যানজট, ট্রেনের টিকিট সংকট ও ব্যয়বহুল আকাশ পথের কারণে কমেছে মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পর্যটক। এছাড়া দুই-তিনদিন অবস্থান করে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখার প্রবণতাও কমেছে। ফলে বড় প্রভাব পড়েছে হোটেল ব্যবসায়।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন যারা সিলেট ঘুরতে আসেন তাদের বড় অংশই নিজস্ব গাড়ি বা রিজার্ভ পরিবহনে দিনে এসে দিনেই ফিরে যান। অন্যদিকে বিমানে ভ্রমণ করতে সক্ষম উচ্চ আয়ের পর্যটকদের উপস্থিতি থাকলেও সেই সংখ্যাও খুবই সীমিত। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিলেটের হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায়।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সংস্কারকাজ, যানজট ও দীর্ঘ সময়ের যাত্রা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে ঢাকায় থেকে সিলেটে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে সময় লাগছে ১০-১২ ঘণ্টারও বেশি। এতে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আগ্রহ কমছে।

ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে সিলেট আসা একজন জানান, রাত ১০টায় রওয়ানা দিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় সিলেটে এসে পৌঁছেছি। সাধারণত রাতে ঢাকা থেকে সিলেট আসতে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগে। কিন্তু যানজট ও নির্মাণকাজের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়তে হয়েছে। দিনে যারা আসছেন তাদের ১৩-১৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগছে।

রাত ১০টায় রওয়ানা দিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় সিলেটে এসে পৌঁছেছি। সাধারণত রাতে ঢাকা থেকে সিলেট আসতে সর্বোচ্চ ৬-৭ ঘণ্টা লাগে। কিন্তু যানজট ও নির্মাণকাজের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়তে হয়েছে। দিনে যারা আসছেন তাদের ১৩-১৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগছে।

রাজধানীর শুক্রবাদ এলাকা থেকে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে আসা একজন পর্যটক বলেন, রিজার্ভ মাইক্রেবাসে সিলেট এসেছি। শুধু সড়কপথে বিলম্বের কারণে পুরো ট্যুর শিডিউল পরিবর্তন করতে হয়েছে। এমনিতেই ছুটি কম। যাতায়াত দুর্ভোগের কারণে সময় অনেক নষ্ট হয়েছে। এখন মাজার জিয়ারত ও সাদা পাথর ঘুরেই চলে যাবো। কারণ যাওয়ার পথেও অনেক সময় লাগবে।

সিলেটের একজন হোটেল ব্যবসায়ী জানান, সিলেটে এখন যে পর্যটকরা আসছেন তাদের বেশিরভাগই নিজস্ব গাড়ি বা রিজার্ভ মাইক্রোবাসে আসেন। সাধারণ পর্যটক, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কম আসছে। ট্রেনের টিকিট পাওয়া কঠিন, আবার বাসে যাত্রা খুব কষ্টকর হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, বিমানে যারা আসছেন তারা মূলত উচ্চ আয়ের মানুষ বা করপোরেট পর্যটক। কিন্তু এ সংখ্যা দিয়ে পর্যটন খাত সচল রাখা সম্ভব না।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সিলেটের পর্যটনখাত মূলত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। তাই যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকলে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে পুরো খাতে। তারা দ্রুত মহাসড়কের দুর্ভোগ কমানো, ট্রেনের টিকিট সংকট নিরসন ও পর্যটনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চলমান দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে ঈদের মৌসুমগুলোতে পর্যটক উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকবে।

সিলেটে মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। সিলেটে দুই-তিনদিন অবস্থান করে ঘুরে দেখা পর্যটকদের সংখ্যা দিনদিন কমছেই। যাদের অবস্থা ভালো বিমানে করে আসতে পরেন তাদের সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ পর্যটক গাড়ি ভাড়া করে দিনে দিনে ঘুরে চলে যান। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল ব্যবসায়। এজন্য পর্যটন ব্যবসায় আর আগের সেই সুদিন নেই।

ট্যুরিজম ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ খতিবুর রহমান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্ভোগ বড় প্রভাব ফেলছে। ছয় লেন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে যানজট লেগেই আছে। স্বাভাবিক সময়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে এখন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়েস্তাগঞ্জ অংশে দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক যাত্রী ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করছেন।

এদিকে অনেক পর্যটক ট্রেনে যাতায়াতের চেষ্টা করলেও সেখানে দেখা দিয়েছে তীব্র টিকিট সংকট। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। আকাশপথে যাত্রীর চাপ বাড়লেও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সেটিও অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

সিলেট হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, ঈদকে ঘিরে সিলেটের হোটেল-মোটেলগুলোতে ৩০-৩৫ শতাংশ আগাম বুকিং হয়েছে। অথচ ঈদ মৌসুমে সাধারণত শতভাগ বুকিং থাকে। এবার খুব বেশি পর্যটক আসছে না। অনেকেই ফোন করে রুমের খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু যাতায়াত পরিস্থিতি শুনে পরে আর বুকিং দিচ্ছেন না।

তিনি আরও বলেন, সিলেটে মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। সিলেটে দুই-তিনদিন অবস্থান করে ঘুরে দেখা পর্যটকদের সংখ্যা দিনদিন কমছেই। যাদের অবস্থা ভালো বিমানে করে আসতে পরেন তাদের সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ পর্যটক গাড়ি ভাড়া করে দিনে দিনে ঘুরে চলে যান। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল ব্যবসায়। এজন্য পর্যটন ব্যবসায় আর আগের সেই সুদিন নেই।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্ভোগ বড় প্রভাব ফেলছে। ছয় লেন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে যানজট লেগেই আছে। স্বাভাবিক সময়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে এখন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়েস্তাগঞ্জ অংশে দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক যাত্রী ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করছেন।

তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাতায়াত দুর্ভোগ ও ট্রেনের টিকিট সংকট। এসব কারণে গত কয়েক বছর ধরেই মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পর্যটকের সংখ্যা কমছে। যারা গাড়ি নিয়ে আসার সক্ষমতা আছে তারাই বেশি আসছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয়লেন প্রকল্পের সিলেট অংশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী দেবাশীষ রায় বলেন, বিগত সরকারের সময়ে কোনো কাজই করা হয়নি। কেউ গুরুত্ব দেয়নি। সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম যোগদানের পরে কাজে গতি এসেছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্বগ্রহণ পরে কাজের গতি আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ১৭টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি ভূমি অধিগ্রহণের ছয়টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলা জুন মাসের মধ্যে আরও শেষ হওয়ার কথা। আর আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকিগুলোও শেষ হওয়ার কথা। যদি ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা শেষ হলে ২০২৮ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়ে যাবে।

দেবাশীষ রায় আরও বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন দপ্তরের অসহযোগিতার কারণে নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে যেভাবে গতি এসেছে, এই গতি আগে থাকলে নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ হতো। এখন যেহেতু ভূমি অধিগ্রহণের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে এগোচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে ২০২৮ বা ২০২৯ সালেই কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম- জাফলং, সাদা পাথর, লালাখাল, শ্রীপুর, রাতারগুল, পান্তুমাই, মায়াবতী ঝরনা, জৈন্তিয়া রাজবাড়ী, ডিবির হাওর, বিছানাকান্দি, লোভাছড়া, মাধবকুণ্ড, চেরাপুঞ্জি, জকিগঞ্জে তিন নদী সুরমা-কুশিয়ারা-বরাক মোহনাসহ অসংখ্য চা বাগান।

এছাড়াও সিলেট নগরীর বুকজুড়ে ছুটে চলা সুরমা নদী, আলী আমজদের ঘড়ি, চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি, রাজা গৌর গোবিন্দের টিলা, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর মাজার অন্যতম।

সিলেট নগরীর কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরগুলোতে ঈদের এক সপ্তাহ আগেই অধিকাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে যেত। এবার এখনো অনেক কক্ষ খালি। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পর্যটকদের বুকিং কমে গেছে।

আরও পড়ুন