উইন্ডসর ক্যাসেলে প্রিন্স উইলিয়ামের হাত থেকে বিশিষ্ট একাউন্টেন্ট আবু তাহেরের এমবিই খেতাব গ্রহণ
লন্ডনের ঐতিহাসিক উইন্ডসর ক্যাসেলে রাজকীয় পরিবেশে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির সুপরিচিত মুখ, বিশিষ্ট হিসাবরক্ষক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক আবু তাহের এমবিই খেতাব গ্রহণ করেছেন।
গত ১৩ মে বুধবার প্রিন্স উইলিয়ামের হাত থেকে তিনি ‘মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (MBE)’ সম্মাননা লাভ করেন।
তাঁর দীর্ঘদিনের পেশাগত সাফল্য, সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা এবং কমিউনিটি উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্য সরকার তাঁকে এ মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত করে।
উইন্ডসর ক্যাসেলে সম্মাননা প্রদান
লন্ডনের নিকটবর্তী ঐতিহাসিক উইন্ডসর ক্যাসেলে আয়োজিত রাজকীয় অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রিন্স উইলিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে আবু তাহেরের হাতে এমবিই সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী মিতা তাহের, একমাত্র মেয়ে অনিকা তাহের এবং ছোট ছেলে তামিম তাহের। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এ গৌরবময় মুহূর্তকে আরও আবেগঘন ও স্মরণীয় করে তোলে।
সম্মাননা গ্রহণের পর আবু তাহের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এমবিই খেতাব পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের। এই স্বীকৃতি আমাকে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে আরও বেশি কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। আমি এই অর্জন আমার পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং কমিউনিটির মানুষদের উৎসর্গ করছি।
প্রবাসজীবনে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করা আবু তাহের ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন দক্ষ ও পেশাদার হিসাবরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৯৯ সালে পূর্ব লন্ডনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Mahi & Co Certified Practising Accountants। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে আর্থিক পরামর্শ ও হিসাবরক্ষণ সেবা দিয়ে সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি Institute of Certified Practising Accountants-এর ফেলো সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় অবদান
পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায়ও আবু তাহেরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা ও লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত Shanghati Literary Society-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি থেকে বর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সংগঠনটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দিয়েছেন। সংগঠনটির উদ্যোগে নিয়মিত কবিতা উৎসব, সাহিত্যসভা, কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
মানবকল্যাণ ও সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও আবু তাহেরের রয়েছে বিস্তৃত সম্পৃক্ততা। তিনি Masuma Memorial Trust-এর মাধ্যমে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান করে আসছেন। নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখতে প্রতিষ্ঠা করেছেন T5 Tailoring Training Centre, যেখানে নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এছাড়া তিনি Vision Care Foundation-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা, অপারেশন ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।
কমিউনিটির গর্ব
সার্বজনীন গোলাপগঞ্জ উৎসবের অন্যতম আয়োজক হিসেবেও তিনি প্রশংসিত। লন্ডনে আয়োজিত এ উৎসব প্রবাসী গোলাপগঞ্জবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয় এবং ব্যাপক সাড়া ফেলে।
বর্তমানে তাঁর আরেকটি স্বপ্নের প্রকল্প “Heaven Care Home” বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যেখানে বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পেশা, সাহিত্য ও সমাজসেবাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে আবু তাহের যে অবদান রেখে চলেছেন, তা প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে এক অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং দেশ-বিদেশে বসবাসরত সমগ্র বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গর্বের বিষয়।