যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের বাসিন্দা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রাজু মোল্লা (৫০)
বাংলাদেশে পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে নিজের স্ত্রীকে ফুটন্ত গরম তেল দিয়ে ঝলসে দিয়ে হত্যার চেষ্টার দায়ে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশিকে ২৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পিত এই পারিবারিক হামলায় ভুক্তভোগীর মুখমণ্ডল স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে গেছে। এই ভয়াবহ সহিংসতার মূলে ছিল বাংলাদেশে থাকা একটি সম্পত্তি নিয়ে তিক্ত বিবাদ।
জানা গেছে, ৫০ বছর বয়সী রাজু মোল্লা এর আগে বাংলাদেশে তার নিজের একটি সম্পত্তি স্ত্রী মোসাম্মৎ মমতাজের নামে লিখে দিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের দিকে তাদের ২৩ বছরের দাম্পত্য জীবনে যখন ফাটল ধরে, তখন রাজু মোল্লা বিবাহবিচ্ছেদ দাবি করেন এবং একই সঙ্গে সেই সম্পত্তি ফেরত চান। মমতাজ সম্পত্তি ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানালে সেই বিরোধ প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রে রূপ নেয়।
২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় স্মল হিথের হিদার রোডে অবস্থিত ওই দম্পতির বাসভবনে এই ঘটনা ঘটে। ওই সময় তখন মমতাজ অসুস্থ ছিলেন। তিনি যখন রান্নাঘরে পিঠ ফিরিয়ে থালা-বাসন পরিষ্কার করছিলেন, তখন রাজু অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় আক্রমণ চালান।
আগে থেকেই একটি বড় পাত্রে রান্নার তেল ফুটিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কোনও সতর্কতা ছাড়াই সেই ফুটন্ত তেল তিনি মমতাজের মাথায় ঢেলে দেন। এরপর চুলা থেকে একটি তপ্ত গরম ফ্রাইপ্যান নিয়ে তার মুখে চেপে ধরেন।
বিচারক রিচার্ড বন্ড এই কাজটিকে গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নৃশংসতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মূলত মমতাজের মুখমণ্ডল স্থায়ীভাবে বিকৃত করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। হামলা এখানেই থেমে থাকেনি; রাজু একটি মপ দিয়ে মমতাজের মুখ চেপে ধরেন যাতে তিনি চিৎকার করতে না পারেন এবং জ্ঞান হারানো অবস্থায় তাকে বারবার লাথি মারেন।
শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে কাটাতে হচ্ছে গভীর সামাজিক ক্ষত। মমতাজ একজন সাংবাদিককে জানান, ন্যায়বিচারের পথ বেছে নেওয়ায় অনেক পরিচিত মানুষ ও বন্ধু তাকে এড়িয়ে চলছেন।
এই বিভংসতা ও মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা তিন সন্তানের জননীকে নিজ ঘরেই ‘বন্দি’ করে ফেলেছে। আয়নার দিকে তাকাতে পারেন না তিনি, এমনকি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নও তাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, রাজুর কাছ থেকে আইনি মুক্তিই তার জীবনের একমাত্র স্বস্তি।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বার্মিংহাম ক্রাউন কোর্টে শুনানির সময় প্রকাশ পায় যে, রাজু মোল্লা জেলখানা থেকে চিঠি পাঠিয়ে মমতাজকে তার সাক্ষ্য প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিয়েছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে বিচারক বন্ড এই ঘটনাটিকে কোনোভাবেই ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে মেনে নেননি। ভুক্তভোগীর ক্ষতের গভীরতা এবং জীবন ধ্বংসের ভয়াবহতা বিবেচনা করে রাজুকে ২৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর মধ্যে অন্তত ১৭ বছর ৪ মাস কারাভোগের পর তিনি প্যারোলে মুক্তির আবেদনের সুযোগ পেতে পারেন। আদালত একই সঙ্গে মমতাজ ও তার সন্তানদের সুরক্ষায় রাজুর ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।