লন্ডন : শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ০১:০৩ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে সমকামী সেজে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অভিবাসীরা

যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে সমকামী সেজে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অভিবাসীরা

যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে সমকামী সেজে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অভিবাসীরা


প্রকাশ: ১৯/০৪/২০২৬ ১২:২২:০২ অপরাহ্ন

যুক্তরাজ্যের ভিসা বা আশ্রয়ের অনুমতি (অ্যাসাইলাম) পেতে ভুয়া সমকামী সাজছেন অনেক অভিবাসী। এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন বেশকিছু আইনজীবী ও পরামর্শক। এর বিনিময়ে তাদের থেকে আদায় করা হচ্ছে কয়েক হাজার পাউন্ড।

এসাইলাম আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহারকারী ‘ভুয়া আইনজীবীদের’ সম্পৃক্তা নিয়ে বিবিসির অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের পর ব্রিটেনে চাঞ্চল্যে সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিবিসির প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণ ভিসায় যুক্তরাজ্যে আসার পর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই এ পথ অবলম্বন করছে।

অভিবাসীদের ভুয়া পরিচয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ জোগাড় করে দিতে কাজ করে বেশকিছু ‘ল’ ফার্ম’। এসব প্রমাণের মধ্যে রয়েছে ডাক্তারের অনুমোদনপত্র, ছবি ও জীবনবৃত্তান্ত।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন বা যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে পাকিস্তানিরা। এরপরই রয়েছে বাংলাদেশিদের অবস্থান।

২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে সমকামী আশ্রয়ের প্রাথমিক আবেদন পড়ে ৩ হাজার ৪৩০টি। এর মধ্যে নতুন আবেদনের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০টি। আবেদনকারীদের ৪২ শতাংশই পাকিস্তানের। পাকিস্তানি অভিবাসীদের মধ্যে ৫৭৮ জন এ আশ্রয়ের আবেদন করে।

একই বছরে বাংলাদেশের ১৭৫ জন আবেদন করেন। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানবিদরা আরও জানিয়েছে, পড়াশোনা বা কাজের ভিসায় আসা পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একাধিক ল’ ফার্ম অভিবাসীদের ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে আশ্রয় পেতে সাহায্য করে। এর মধ্যে অন্যতম ওরচেস্টার এলজিবিটি। তারা ভুয়া আবেদনের জন্য অভিবাসীদের থেকে সাত হাজার পাউন্ড (প্রায় ১০ লাখ টাকা) পর্যন্ত নিয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলেও জানান ওরচেস্টারের এক পরামর্শক। এমনকি অভিবাসীরা একবার সমকামী পরিচয়ে আশ্রয় পেয়ে যাওয়ার পর তাদের স্বামী বা স্ত্রীকেও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

বিবিসির সাংবাদিকরা শিক্ষার্থী ছদ্মবেশে ওরচেস্টারের প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তারা ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে এ ধরনের ভিসা পেতে কাজ করে আসছে।

তারা পাকিস্তানি পরিচয় দেওয়া ওই সাংবাদিককে সমকামী প্রমাণ করতে সাক্ষীও জোগাড় করে দিতে চান। তারা জানায়, একজন আবেদনকারীকে এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে পরিচয় দিয়েও আশ্রয় পাইয়ে দিতে সাহায্য করেছে অরচেস্টার।

যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, ভুয়া তথ্য দিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করা অপরাধ। দোষী প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড এবং পরে বহিষ্কারের শাস্তি হতে পারে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা বলেছেন, এ ধরনের কাজ সরাসরি প্রতারণা এবং এটি প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ।

ব্রিটিশ সংসদের সদস্যরা এই ঘটনার তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কেউ কেউ আশ্রয় ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই ধরনের প্রতারণা প্রকৃত বিপদগ্রস্ত সমকামী ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এতে তাদের দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এদিকে বিরোধী দলগুলো এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশ্রয় ব্যবস্থার পূর্ণ সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। হোম অফিস আগে থেকেই এমন প্রবণতা নিয়ে তদন্ত করছিল, যেখানে কিছু ব্যক্তি নিজেদের সমকামী সাজিয়ে ভুয়া আশ্রয় দাবি করছে। পাশাপাশি, গৃহ নির্যাতনের শিকারদের সুরক্ষার জন্য প্রণীত নিয়মের অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

বিবিসির অনুসন্ধানে জানা গেছে, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, তাদেরকে ভুয়া গল্প তৈরি করতে সহায়তা করা হচ্ছে এবং মিথ্যা প্রমাণ জোগাড় করার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে, আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শদাতারা হাজার হাজার পাউন্ড নিয়ে এসব ভুয়া দাবি তৈরির কৌশল শেখাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু অভিবাসী ব্রিটিশ নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বা বিয়ে করে পরে গৃহ নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ এনে দ্রুত স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হোম অফিস তদন্ত শুরু করেছে।

রিপোর্ট প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, এসব দাবির ক্ষেত্রে কঠোর ও নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেন, হোম অফিস এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইস অথরিটি একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়। দেশটির সরকার ইতিমধ্যে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখিত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।

আরও পড়ুন