লন্ডন : রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২২ পূর্বাহ্ন

এবার এআইয়ে ঝুঁকছেন ব্রিটিশরা

এআইয়ে ঝুঁকছেন ব্রিটিশরা

এআইয়ে ঝুঁকছেন ব্রিটিশরা


প্রকাশ: ০৪/০৪/২০২৬ ০৫:০৬:০৪ অপরাহ্ন

যুক্তরাজ্যের ডিজিটাল জগতে এখন এক অদ্ভুত ‘শীতল যুগ’ বা ‘সোশ্যাল কুলিং’ চলছে। দেশটির লাখ লাখ মানুষ এখন আর নিজেদের জীবনের গল্প বা মতামত জনসমক্ষে শেয়ার করছেন না।

বরং তারা স্রেফ ‘দর্শক’ হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট, কমেন্ট বা শেয়ার করার হার গত বছরের তুলনায় নাটকীয়ভাবে কমে বর্তমানে ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘প্যাসিভ’ বা নিষ্ক্রিয় ব্যবহারকারী হয়ে উঠেছেন। ডিজিটাল পদচিহ্ন স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার উদ্বেগ থেকেই এই পরিবর্তনের শুরু।

একজন সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্লেষক জানান, এখন আর কেউ নিজের মত প্রকাশকে নিরাপদ মনে করছেন না। বরং এটি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত জীবনের জন্য ঝুঁকি বলে মনে হচ্ছে। ফলে স্থায়ী পোস্টের জায়গা দখল করে নিচ্ছে ২৪ ঘণ্টা পর মুছে যাওয়া ‘স্টোরি’ কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো ব্যক্তিগত মেসেজিং অ্যাপ।

ফেসবুক হারিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন থাকলেও যুক্তরাজ্যে এটি এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম, যার মার্কেট শেয়ার ৭২.৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের শুরুতে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৮.৭ মিলিয়নে পৌঁছালেও মানুষ এখন আর এখানে ব্যক্তিগত ‘স্ট্যাটাস আপডেট’ দেয় না।

ফেসবুক এখন মূলত মার্কেটপ্লেস বা কমিউনিটি গ্রুপের মতো দরকারি কাজের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা এর মূল ব্যবহারকারী হলেও জেন-জিরা বেশি ঝুঁকছে টিকটক ও ইউটিউবের দিকে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সঙ্গে ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান সখ্য। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআই টুলের ব্যবহার এক বছরে ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। অবাক করার মতো বিষয় হলো, প্রতি আট জন এআই ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন এখন মানসিক সহায়তা বা একাকিত্ব ঘোচাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

সাংবাদিক ও সমালোচক মাহবুবুল করীম সুয়েদ এ বিষয়ে বলেন, মানুষ যখন অন্য মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে, তখন তারা অ্যালগরিদমের কাছে নিজেদের বেশি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চুপচাপ স্ক্রল করে যাওয়ায় কমেন্ট সেকশনগুলো এখন চরম মেরুকৃত ও কট্টর মতাদর্শীদের দখলে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে পুরুষরা মূলধারার সংবাদমাধ্যম ছেড়ে স্বাধীন ইউটিউব নির্মাতাদের দিকে ঝুঁকছেন। এতে তথ্যের ক্ষেত্রে একটি ‘আস্থার ঘাটতি’ তৈরি হচ্ছে।

যুক্তরাজ্য এখন ‘অংশগ্রহণকারী’ নয়, বরং ‘দর্শক’দের দেশে পরিণত হয়েছে। রিলস ও টিকটকের মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও এখন মূল আকর্ষণ।

ব্রিটিশরা এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে টেলিভিশনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং মহামারির সময়ের চেয়েও দৈনিক গড়ে ৩১ মিনিট বেশি সময় অনলাইনে কাটাচ্ছেন। ২০২৬ সালের ট্রেন্ড বলছে, মানুষ এখন ছোট ছোট ‘মাইক্রো-ড্রামা’ এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর বিনোদনে মগ্ন।

দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ ফোনের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার কথা স্বীকার করলেও ব্যবহারের হার কমার কোনও লক্ষণ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে ব্রিটিশদের ডিজিটাল জীবন আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠবে।

পাবলিক ফিডগুলো অ্যালগরিদমচালিত বিনোদনের দখলে চলে যাবে, আর আসল সামাজিক যোগাযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে হোয়াটসঅ্যাপ বা ডিসকর্ড-এর মতো গোপন পরিসরে।

আরও পড়ুন