লন্ডন : বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫১ অপরাহ্ন

বিলেতে ছুটি বিহীন লাখো বাংলাদেশির ঈদের আনন্দ বঞ্চিত

বিলেতে ঈদের দিন ঈদের নামাজের পর কাজে ফিরছেন বাংলাদেশী মুসলিমরা

বিলেতে ঈদের দিন ঈদের নামাজের পর কাজে ফিরছেন বাংলাদেশী মুসলিমরা


প্রকাশ: ২০/০৩/২০২৬ ০৯:৫৫:০০ অপরাহ্ন

আধুনিক ব্রিটেনে সরকারি-বেসরকারি সকল সেক্টরে কর্মীরা সবেতন ছুটি ও ব্যাংক হলিডে ভোগ করলেও ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলো।

পবিত্র রমজান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হলে আজ ২০ মার্চ (শুক্রবার) সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মিল রেখে ব্রিটেনেও ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

শুক্রবার ঈদ হওয়া মানেই বিলেতের সাধারণ কর্মজীবীদের জন্য তিন দিনের লম্বা ছুটির হাতছানি। তবে বিলেতের ‘কারি ইন্ডাস্ট্রি’ বা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট খাতের লাখো শ্রমিকের জন্য এই আনন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বিষাদময় বাস্তবতা। অধিকারহীন এক লাখ শ্রমিক ও ব্রিটেনের শ্রম আইন।

ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের প্রায় অর্ধেকই সরাসরি রেস্টুরেন্ট খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ খাতে এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজ করলেও বছরের পর বছর ধরে তারা ঈদের ছুটি থেকে বঞ্চিত।

এই খাতের ৯৫ শতাংশ মালিক ও শ্রমিক বাংলাদেশি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ঈদের দিন কর্মীদের অশ্রু ঝরে রান্নাঘরে কিংবা বারের পেছনে। বিশেষ করে অবৈধ বা অনিয়মিত কর্মীরা চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ ফুটে ছুটির দাবিও করতে পারেন না।

ব্রিটেনের মতো আধুনিক ও উন্নত দেশে বসবাস করেও বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলোতে কর্মরত শ্রমিকরা বছরের পর বছর ধরে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মালিকপক্ষের একাধিক সংগঠন থাকলেও শ্রমিকদের কোনও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম না থাকায় এবং তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ না থাকায় এই অমানবিক বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে মালিকের কাছে ছুটির দাবিটুকুও করতে পারেন না।

মালিকপক্ষ যখন সপরিবারে ঈদের উৎসব উদযাপনে ব্যস্ত থাকেন, তখন এসব কর্মীর ভাগ্য জোটে রেস্টুরেন্টের তপ্ত রান্নাঘর বা বারের অন্ধকার কোণ। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ কেবল ফেলে আসা দেশের স্মৃতির মতোই ধূসর হয়ে থাকে।

ব্রিটেনের শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে সকল পর্যায়ের কর্মীরা— সে ডাক্তার, প্রকৌশলী, কর্পোরেট কর্মকর্তা কিংবা পরিচ্ছন্নতা কর্মী যাই হোন না কেন— নির্দিষ্ট ব্যাংক হলিডে ও উৎসবের ছুটি সমানভাবে ভোগ করেন। এ অধিকার তাদের নাগরিক ও আইনি সুরক্ষায় রক্ষিত।

ট্রেড ইউনিয়নগুলোও কর্মীদের এই অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর। কিন্তু এই অধিকারের সুবাতাস যেন বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট খাতের লাখো কর্মীর জন্য নিষিদ্ধ।

ওয়েটার, কুক, শেফ কিংবা ম্যানেজার— এই সেক্টরে জড়িত কেউই সরকারি ছুটির তোয়াক্কা করেন না, উল্টো বছরের দুটো ঈদের দিনেও তাদের ছুটি মেলে না। রেস্টুরেন্ট খোলা থাকার দোহাই দিয়ে তাদের এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে কর্মীরা ঈদের ছুটির দাবি জানিয়ে আসলেও ‘বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন’সহ মালিকপক্ষ এ বিষয়ে কোনও কার্যকর নির্দেশনা বা ব্যবস্থা নেয়নি।

অথচ টাওয়ার হ্যামলেটসসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুলগুলোতে প্রধান শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ঈদের জন্য অনানুষ্ঠানিক ছুটি দিয়ে থাকেন এবং ব্রিটেনে মুসলিম কর্মীদের জন্য ঈদের দিনের ছুটি এখন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।

আসন্ন ঈদুল ফিতর শুক্রবার পড়ায় অনেকেই সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে তিন দিনের ছুটি উপভোগ করতে পারবেন, কিন্তু রেস্টুরেন্ট কর্মীদের কপালে সেই ছুটি জোটা তো দূরের কথা, ঈদের দিনে কাজের জন্য কোনো ওভারটাইম বা অতিরিক্ত সুবিধাও দেওয়া হয় না।

দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের একটি টেকওয়ে রেস্টুরেন্টের প্রধান শেফ আবু তাহের আক্ষেপ করে বলেন, “পূর্ন এক মাস রোজা রেখে যখন আনন্দের ঈদ আসে তখন মালিক আমাদের ছুটি দেন না। শুধু নামা‌জের ছু‌টি মে‌লে।

নামাজ পড়া ছাড়া আমরা ছেলে মেয়ে নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারি না। আমরা রেস্টুরেন্ট শ্রমিকদের একতা নেই বলে মালিক পক্ষ ঈদের ছুটি থেকে আমাদের বঞ্চিত করে রাখে।

বিলেতের শ্রম আইন অনুযায়ী উৎসবের ছুটি পাওয়ার অধিকার সবার থাকলেও কারি ইন্ডাস্ট্রিতে তা উপেক্ষিত। ২০২৬ সালের ঈদ শুক্রবারে হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কারণ ব্রিটেনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সবচেয়ে লাভজনক রাত হলো শুক্রবার। ব্যবসায়িক ক্ষতির অজুহাতে মালিকরা কর্মীদের ছুটি দিতে নারাজ।

এ বিষয়ে ব্রিটিশ রেষ্টুরেন্ট মালিকদের সর্ববৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ) ইউকে-এর সভাপতি অলি খান এমবিই বলেন, শুক্র ও শনিবার এ দেশে রেস্টুরেন্টের মূল ব্যবসা হয়। এই দুই দিনে ঈদ না পড়লে এখন অনেক মালিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখছেন। আর ঈদের দিন খোলা থাকলেও কর্মীরা বিকাল পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে ছুটি পান।

তিনি বলেন, আমরা বিসিএ-র পক্ষ থেকে ঈদের দিন রেস্টুরেন্ট বন্ধ রেখে কর্মীদের ছুটি দেওয়ার প্রচারণা চালাচ্ছি। কেউ বন্ধ রাখলে তাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

তিনি আরও জানান, ব্রিটেনে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেষ্টুরেন্ট আছে। সরাসরি এক লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী এ সেক্টরে কাজ করছেন এবং বছরে এই সেক্টর থেকে সরকারকে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব দেওয়া হচ্ছে।

লক্ষা‌ধিক কর্মীর ঈ‌দের দি‌নের ছ‌ু‌টির দা‌বির প্রতি সম্পূর্ণ একমত জানিয়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ক্রিসমা‌সের দিন রেষ্টু‌রেন্ট বন্ধ রাখ‌তে পার‌লে ঈ‌দের দিন কেন পারবো না?

এটি নাগরিক ও মানবিক অধিকারের লঙ্ঘন। কর্মীবান্ধব পরিবেশের অভাবেই আজ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ধস নামছে।

কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম না থাকায় মালিকপক্ষ এই সুযোগ নিচ্ছে। ঈ‌দের ছু‌টি কর্মী‌দের অ‌ধিকার। কিন্তু মা‌লিকরা নানা অজুহাতে তা থে‌কে লাখো কর্মী‌দের ব‌ঞ্চিত ক‌রেন।

ব্রিটেনে ঈদের দিন সরকারি ছুটির দাবি দীর্ঘদিনের হলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মুসলিম ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপিরা এ নিয়ে সোচ্চার নন বলে জানান কমিউনিটির নেতারা।

এই বঞ্চনার বিপরীতে মানবিকতার অনন্য নজির গড়েছেন সাউথ-ওয়েস্ট লন্ডনের ‘কারি লিফ’ রেস্টুরেন্টের মালিক আব্দুল মজিদ মাসুদ ও জাহেদ আহমেদ। বিগত ২০ বছর ধরে তারা ঈদের দিন রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখছেন।

তাদের মতে, অন্য ধর্মাবলম্বীরা আমাদের ধর্মকে সম্মান করে, তাই বন্ধ রাখলে ব্যবসায় ক্ষতি হয় না।

আরও পড়ুন