দুবাইয়ের ব্যবসায়ীকে ব্রিটেনের বন্দর প্রকল্পে এপস্টেইনের সহায়তার অভিযোগ
দুবাইয়ের ব্যবসায়ীকে ব্রিটেনের বন্দর প্রকল্পে এপস্টেইনের সহায়তার অভিযোগ
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন যুক্তরাজ্যের একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের কাজে জড়িত ছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে এই তথ্য। এ খবর দিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ।
নথি অনুযায়ী, দুবাইয়ের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমকে সহায়তা করে এপস্টেইন ব্রিটিশ সরকারের তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনের কাছে লবিং করেছিলেন, যাতে থেমস নদীর তীরে ১.৮ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বন্দর প্রকল্পে সরকারি সমর্থন আদায় করা যায়।
এতে বলা হয়, সুলতান বিন সুলায়েম সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান। ২০০৯ সালে তিনি লন্ডন গেটওয়ে নামের গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের ঋণ-গ্যারান্টি ও বিনিয়োগ পেতে উদ্যোগ নেন। এ সময় এপস্টেইন তার হয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের মে মাসে সুলতান বিন সুলায়েমের লেখা একটি ইমেইল এপস্টেইন লর্ড ম্যান্ডেলসনের কাছে ফরোয়ার্ড করেন। তখন ম্যান্ডেলসন যুক্তরাজ্যের ব্যবসা সচিব ছিলেন।
ইমেইলে লন্ডন গেটওয়ে প্রকল্পকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরাসরি সরকারি সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছিল।
সে সময় এসেক্সে থেমস নদীর তীরে এই বন্দর নির্মাণ করছিল ডিপি ওয়ার্ল্ড। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল, প্রকল্পটি ৩৬ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ৩.২ বিলিয়ন পাউন্ড যোগ করবে।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে সুলতান বিন সুলায়েম এপস্টেইনকে আরেকটি ইমেইলে লেখেন। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে সরকারি গ্যারান্টি প্রয়োজন।
নভেম্বর ২০০৯-এর এক ইমেইলে তিনি ম্যান্ডেলসনের উদ্দেশে পাঠানো একটি বার্তা এপস্টেইনের মাধ্যমে পর্যালোচনা করান। সেখানে যুক্তরাজ্য সরকারকে ঋণের গ্যারান্টি দেয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুমের আসন্ন রাষ্ট্রীয় সফরের প্রেক্ষাপটে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বার্তায় সতর্ক করে বলা হয়, করদাতাদের সহায়তা না পেলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এতে ম্যান্ডেলসনের কাছে ব্যাংক ঋণের জন্য সরকারি ‘র্যাপ’ বা গ্যারান্টি দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এপস্টেইন পরে জানান, তিনি বার্তাটিতে ছোটখাটো সম্পাদনা করেছেন।
একটি অন্য ইমেইলে এপস্টেইন বলেন, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি সুলায়েমকে ম্যান্ডেলসনের ব্যক্তিগত ইমেইল ঠিকানাও দিয়েছিলেন।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড ঘোষণা দেয়, তারা যুক্তরাজ্যে বন্দর প্রকল্পটি এগিয়ে নেবে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন একে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতি বিশাল আস্থার ভোট বলে আখ্যা দেন। উল্লেখ্য, এই ইমেইল বিনিময়ের সময় ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজেও আর্থিক সংকটে ছিল এবং শেষ পর্যন্ত আবুধাবির সহায়তায় উদ্ধার পায়।
সর্বশেষ প্রকাশিত ইমেইলগুলো এপস্টেইনের বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেছে। নথি অনুযায়ী, সুলতান বিন সুলায়েমের সঙ্গে এপস্টেইনের শতাধিক ইমেইল আদান-প্রদান হয়েছিল, যার মধ্যে বিতর্কিত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তাও রয়েছে।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে যৌন পাচারের অভিযোগের মুখে এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। তার বিরুদ্ধে বহু নারী অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি তাদের যৌন পাচারে বাধ্য করেছিলেন এবং ক্যারিবীয় দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমসে যৌন নির্যাতন করেছিলেন।
ফাঁস হওয়া এই নথিগুলো লর্ড ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্কের গভীরতাও প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের পর রোববার রাতে তিনি লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন। নথিতে তার ব্যক্তিগত ছবি এবং এপস্টেইনের কাছ থেকে পাওয়া হাজার হাজার ডলারের অর্থ লেনদেনের তথ্যও রয়েছে।
২০১৪ সালের এক ইমেইলে এপস্টেইন ম্যান্ডেলসনকে জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড তাকে কোম্পানির বোর্ডে যোগ দিতে রাজি করাতে বলেছিল। ডিপি ওয়ার্ল্ড ও লর্ড ম্যান্ডেলসনের কাছে মন্তব্য চাওয়া হয়েছে। ম্যান্ডেলসন বলেছেন, তিনি এপস্টেইনকে চেনার জন্য অনুতপ্ত এবং তার নির্যাতনের শিকারদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন।