মসজিদে আল খায়েফ
আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘মসজিদে আল খায়েফ’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
মসজিদে খায়েফ একমাত্র মসজিদ যেখানে ৭০ জন নবী নামাজ আদায় করেছেন বলে জানা যায়। বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ সা. এই মসজিদে নামাজ আদায় করছেন এবং বলেছেন, এখানে সত্তরজন নবী সমাহিত হয়েছেন।
মক্কা থেকে মিনার দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। মিনায় হাজিদের জন্য স্থাপিত বিশেষ তাঁবুতে অবস্থান করে হজের বেশকিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। হজের আনুষ্ঠানিকতার অন্যতম অংশ হলো- শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে কঙ্কর নিক্ষেপ করা। এই কঙ্কর নিক্ষেপের স্থানের খুব কাছে ঐতিহাসিক ‘মসজিদে খায়েফ’ অবস্থিত।
নবী রাসূলদের আগমন: মুসা (আ.) সহ ৭০ জন নবী রাসূল এই মসজিদে নামাজ পড়েছেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে, যা এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
ষড়যন্ত্রের স্থান ইসলামের প্রাথমিক যুগে এখানেই মক্কাবাসীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি গোপন ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করেছিল।
হাজিদের মিলনস্থল হজের সময় মিনায় অবস্থানকারী হাজিরা এখানে নামাজ আদায় করেন এবং এটি দোয়া কবুলের একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রাচীন ভিত্তি এই মসজিদটি বহু শতাব্দী পুরোনো, এবং এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই।
মামলুকি সুলতান কাইতবা ৮৭৪ হিজরিতে মিসরের সুলতান কাইতবা এটি পুনর্নির্মাণ করেন, যা অনেক দশক টিকে ছিল বিশাল সম্প্রসারণ ১৪০৭ হিজরিতে (১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে) এর একটি বড় সম্প্রসারণ করা হয়, যা আয়তনে প্রায় চারগুণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার বর্গমিটার করা হয় এবং এতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ করা হয়।
বর্তমান অবস্থা বর্তমানে এটি প্রায় ৩৫,০০০ মুসল্লি ধারণ করতে সক্ষম এবং মিনায় হজ ও উমরার সময় হাজিদের জন্য খোলা থাকে, যা হজ মৌসুমে মিনায় পালনীয় ধর্মীয় কার্যাবলীর কেন্দ্রবিন্দু।
পবিত্র নগরী সৌদি আরব। একটি মুসলিম দেশ। ইসলামের প্রথম ও প্রধানতম উৎপত্তিস্থল হিসেবে এই নগরীর গুরুত্ব অন্যান্য মুসলিম দেশ অপেক্ষা একটু বেশি। মুসলমানদের পবিত্রতম স্থান কাবা ও রাসূলের সা. রওজা মোবারক সৌদিতে অবস্থিত বিধান এই নগরী বা দেশটি মুসলিম বিশ্বের কাছে আরো একটু বেশি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসারস্থল। ইসলাম ও মুসলিমের অস্তিত্বের সাথে জড়িত নানা নিদর্শনের দেশ সৌদি আরব। সেখানে রয়েছে পবিত্র স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র সব নিদর্শন।
ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সা. সহ বহু নবী-রাসূলের পবিত্র সব স্মৃতি ধন্য নানা নিদর্শন রয়েছে এ নগরীর বিভিন্ন স্থানে। তেমননি একটি পবিত্র নিদর্শন আল খায়েফ মসজিদ। এই মসজিদটি মিনার দক্ষিণে ছোট জমরাতের কাছাকাছি একটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। ইসলামের ইতিহাসে এটি এমন একটি মসজিদ সেখানে মহানবী সা. সহ আরো অনেক নবী-রাসূলগণ নামাজ আদায় করেছেন।
মসজিদ আল খাইফের গুণাবলী কিছু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হজরত ইবনে আব্বাসের রা. একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, ‘মসজিদু আল খাইফে সত্তর নবী-রাসূল নামাজ প্রার্থনা আদায় করেছেন’।
[মজমাউজ জাওয়াহিদ] কারো কারো মতামত হলো, এই মসজিদে ৭০ জন নয় বরং ৭০০ জন বা তারও অধিক সংখ্যক নবী-রাসূল নামাজ (প্রার্থনা) আদায় করেছেন। তবে এই সংখ্যা ও মতামতের পক্ষে গ্রহণযোগ্য শক্তিশালী কোনো তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি।
নবী-রাসূলদের প্রার্থনা বা নামাজ আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ছাড়াও এই মসজিদটি ইসলামের ইতিহাসের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ধারণ করে আছে। আর তা হালো- পঞ্চম হিজরিতে ইহুদিদের ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারনা মক্কার কাফেরা মদিনায় হামলা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এই হামলা উপলক্ষে মক্কার কাফেররা বড় বড় ও শক্তিশালী কিছু আরব গোত্রের সাথে চুক্তি সম্পাদিত করে। পরবর্তীতে ইসলামের বিজয়ের পর এই চুক্তি সম্পাদিত স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। ইসলামের ইতিহাসের সেই স্মৃতি ধারণকারী মসজিদটিই হলো আল খায়েফ মসজিদ।
হযরত রাসূলুল্লাহ সা. খায়েফ মসজিদের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন ওসমানিয় শাসনামলে সেখানে একটি বড় গম্বুজ ও মেহরাব তৈরি করা হয়। এখন অবশ্য সেটি আর নেই।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, ২৪০ হিজরিতে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যায় খায়েফ মসজিদ ধসে পড়ে। তবে বন্যা শেষ হওয়ার পরপরই মসজিদটি আবার নির্মাণ করা হয় এবং এর চারপাশে বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়। সে সময় এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ছিল ১২০ মিটার এবং প্রস্ত ছিল ৫৫ মিটার। সে হিসাবে এটি ছিল ওই সময় আরব অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মসজিদ।
এমনকি তখন মসজিদে হারামের চেয়েও বড় ছিল এই মসজিদের আয়তন। ৮৭৪ হিজরিতে মিসরের মামলুকি সুলতান কাইতবা এই মসজিদ পুননির্মাণ করেন। মসজিদের ওই স্থাপনাটি কয়েক দশক আগ পযন্ত বিদ্যমান ছিল।
এখন থেকে তিন দশক আগে ১৪০৭ হিজরিতে এই মসজিদ পরিবধন ও পুননির্মাণের এক বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মসজিদের আয়তন আগের চেয়ে চারগুণ বাড়িয়ে প্রায় ২৫ হাজার বর্গমিটার করা হয়। খায়েফ মসজিদে এখন ৩০ হাজার মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।
মসজিদের চারকোণায় অবস্থিত চারটি সুউচ্চ মিনার মসজিদটিকে দান করেছে অপার সৌন্দর্য।হজের মৌসুমে মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের সময়টাতে মসজিদটি মুসল্লিদের প্রচুর ভিড় দেখা যায়। মসজিদের সামনে স্থাপিত সাইনবোডে বেশ ৭টি ভাষায় লেখা রয়েছে মসজিদের নাম। সেখানে বাংলাতেও লেখা আছে- ‘আল খায়েফ মসজিদ’।