বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে পাঁচদিন ও আসামিপক্ষে তিনদিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে।
আগামী ১৩ই নভেম্বর মামলাটির রায়ের দিন নির্ধারণের তারিখ ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ তারিখ ঘোষণা করেন।
মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি খণ্ডন শেষে সমাপনী বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জুলাই হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ আসামিদের শাস্তি দিতে না পারলে শহীদ ও আহতদের প্রতি অবিচার করা হবে।
একই সময় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চান তিনি। মামলায় আসামি শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন প্রসিকিউশন পক্ষ। তবে, মামুনের বিষয়টি সম্পূর্ণ ট্রাইব্যুনালের বিবেচনার কথা বলেছে প্রসিকিউশন।
অন্যদিকে, আসামিদের নির্দোষ দাবি করে তাদের খালাস চেয়েছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত তাদের আইনজীবী। এ ছাড়া, রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনেরও খালাস চেয়েছে তার আইনজীবী।
এই বিচারে আমরা যা প্রমাণ করেছি, সেটা সন্দেহাতীত: এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলার সমাপনী বক্তব্য শুরু করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ মামলা প্রমাণের জন্য দালিলিক, মৌখিক, সারকামস্টেনশিয়াল সাক্ষী উপস্থাপন করেছেন।
কিন্তু আসামিপক্ষ বলেছেন, আসামিরা গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ দেননি, তারা নির্দোষ। ভাগ্যিস উনি (আসামিপক্ষের আইনজীবী) বলেননি বাংলাদেশে কোনো জুলাই বিপ্লব হয়নি। ভাগ্যিস উনি বলেননি বাংলাদেশে ১৪শ’ মানুষ মারা যায়নি, ৩০ হাজারের উপরে মানুষ আহত হয়নি।
কিন্তু বাংলাদেশের ১৪শ’ মানুষ মারা গেলেন। এই ফ্যাক্টটাকে যদি আমরা সামনে রাখি, সারা দেশে এতবড় একটা জুলাই বিপ্লব হলো, সারা দেশে হত্যাকাণ্ড হলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় স্টেট অ্যাপারেটাস (রাষ্ট্রযন্ত্র) ব্যবহার করে তাহলে কে করলেন?
তিনি বলেন, আদালতের কাছে আমাদের নিবেদন হচ্ছে, অপরাধ কে বা কারা করেছে, কীভাবে করেছে প্রসিকিউশনের উপস্থাপন করা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সেটি তুলে ধরা হয়েছে। আসামিরা যে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, পদ্ধতিগতভাবে ব্যাপক মাত্রায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
এই বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। কার নির্দেশনা ছিল, কীভাবে নির্দেশনা ছিল, কার কাছে নির্দেশনা ছিল, নির্দেশনা কীভাবে অপারেট করা হয়েছে, কে অপারেট করেছেন, কে এক্সিকিউট করেছেন নির্দেশনা। শেখ হাসিনাসহ আসামিরা এই বিচার প্রতিহত করতে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি যে সাক্ষ্য-প্রমাণ আপনাদের সামনে এসেছে, সেই সাক্ষ্য বিশ্বের যেকোনো দেশের যেকোনো আদালতের সামনে উপস্থাপন করলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে এই আসামিদের সাজা প্রদান ছাড়া বিকল্প কোনো পথ থাকবে না আদালতের সামনে।
এই ন্যায়বিচার যদি আমরা না করতে পারি, তাহলে আমরা বাংলাদেশে মানুষ হিসেবে কবি হেলাল হাফিজের ভাষায় উত্তর পুরুষের ভীরু কাপুরুষের উপমা হয়ে রয়ে যাবো। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আমি প্রত্যাশা করেছিলাম উনি (শেখ হাসিনা) ন্যায়বিচারের সামনে আসবেন।
উনি এক রাজনৈতিক বক্তৃতায় আরেকজন রাজনৈতিক নেতার রেফারেন্স টেনে বলেছিলেন, সাহস থাকলে বাংলাদেশের মাটিতে এসে বিচারের মুখোমুখি হোক। আমার বিশ্বাস ছিল, উনি এই কথাটা মন থেকে বলেছিলেন।
আমার বিশ্বাস ছিল, উনি এটা বিশ্বাস করে বলেছিলেন। আজকে আমি দেখলাম, উনি মন থেকে বলেননি, বিশ্বাস থেকে বলেননি। উনার যদি সাহস থাকতো তাহলে উনি বাংলাদেশের মাটিতে এসে এই বিচারের মুখোমুখি হতেন।
রাষ্ট্রের মধ্যে শেখ হাসিনা একটা সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) লাগানোর চেষ্টা করেছেন: এত বড় অপরাধ করেও আসামিদের মাঝে কখনোই কোনো অনুশোচনা রয়েছে এমনটা পরিলক্ষিত হয়নি বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মধ্যে শেখ হাসিনা একটা সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) লাগানোর চেষ্টা করেছেন। সেনাবাহিনীকে বলার চেষ্টা করেছেন, তোমাদের অফিসারদের বিচার হয়, তোমরা কেন রুখে দাঁড়াচ্ছো না? চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যারা এখানে আসামি হয়েছেন, তাদের (শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান) মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই।
এত বড় অপরাধ করেছেন, দুনিয়ার সবাই জানে এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তিনিও জানেন। কিন্তু কখনোই তার মধ্যে কোনো ধরনের অনুশোচনা পরিলক্ষিত হয়নি।
উল্টো তিনি যারা তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের হত্যা করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেয়ার কথা বলছেন। তাদের লাশগুলো বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়ার কথা বলছেন।
শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন: অ্যাটর্নি জেনারেল ও চিফ প্রসিকিউশনের বক্তব্য শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী আমির হোসেনকে কথা বলার সুযোগ দেন।
এ সময় তিনি বলেন, আমি অ্যাটর্নির কথার জবাবে একটু বলতে চাই যে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন এটি নয়। উনি (শেখ হাসিনা) এ কথাও বলেছেন যে, আমাকে প্রয়োজনে এখানে মাটি দেন, হত্যা করেন, তবু আমি যাবো না।
কিন্তু প্রেক্ষাপট এমন দাঁড়িয়েছে উনাকে যেতে বাধ্য করেছেন। উনি হেলিকপ্টারে গেছেন। দেশের মানুষ দেখেছেন। অতএব পালিয়ে যাওয়া বলে চোরের মতো লুকিয়ে যাওয়াটাকে। তবে এই পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টা আমি দ্বিমত পোষণ করছি।
এ ছাড়া, একটি বিদেশে থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সাহস থাকলে দেশে এসে বিচারের মুখোমুখি হতে। আমার কথা হচ্ছে- যে কারণে উনি দেশে এসে বিচারের মুখোমুখি হননি। আমার আসামি শেখ হাসিনাও একই কারণে বাংলাদেশে এসে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন না।