লন্ডন : বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫১ অপরাহ্ন

মুসলিমবিদ্বেষের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রে

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম কমিউনিটি

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম কমিউনিটি


প্রকাশ: ২০/০৩/২০২৬ ০৯:৪৭:১০ অপরাহ্ন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিজেদের ধর্মীয় স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। তারা একটি রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশন গঠন করেছে, ধর্মভিত্তিক স্কুলগুলোর জন্য অর্থায়ন বাড়িয়েছে এবং টিকা নীতিতে পরিবর্তন এনে আরও বেশি ধর্মীয় অব্যাহতির সুযোগ দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একবার বড়দিনে নাইজেরিয়াতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেন। ওই হামলাকে তিনি এমন একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান বলে বর্ণনা করেছিলেন যারা খ্রিস্টানদের হত্যা করছিল। তার প্রশাসন ইহুদিবিদ্বেষ ঠেকানোর নাম করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শাস্তিও দিয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা লিখেছে। এ বছর ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, আমি ধর্মের জন্য অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি কাজ করেছি।

কিন্তু এই প্রচেষ্টার একটি ব্যতিক্রম আছে। ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান পার্টি মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় তেমন আগ্রহী বলে মনে হয় না। বরং তারা প্রায়ই ইসলামের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করেন।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনেক সময়ই অত্যন্ত নিন্দনীয়। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী থাকা অবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান। এর একটি ধারা এখনও কার্যকর।

তিনি একবার বলেন, আমি মনে করি ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনীতিক একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। আলাবামার সিনেটর টমি টিউবারভিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, এটি একটি কাল্ট।

টেক্সাসের প্রতিনিধি ব্র্যান্ডন গিল লিখেছেন, ইসলাম আমাদের সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ফ্লোরিডার প্রতিনিধি র‌্যান্ডি ফাইন বলেন, সব মূলধারার মুসলিম অভিবাসীদের আইনগত বা অবৈধ চরমভাবে বহিষ্কার করা উচিত এবং যেখানে সম্ভব নাগরিকত্ব বাতিল করা উচিত।

টেনেসির প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে দেশ থেকে বহিষ্কারের দাবি করেন। তিনি সম্প্রতি লিখেছেন, মুসলমানদের আমেরিকান সমাজে কোনো জায়গা নেই।

ট্রাম্প প্রায়ই মুসলিম সম্প্রদায় ও রাজনীতিবিদদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। যদিও তিনি সব সময় ধর্মের নাম উল্লেখ করেন না, তবু এই প্রবণতা স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সোমালি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা কিছুই অবদান রাখে না। আমি তাদের আমাদের দেশে চাই না। তিনি তাদের কম আইকিউয়ের মানুষ বলেও উল্লেখ করেন।

মিনেসোটার সোমালি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরকে তিনি আবর্জনা বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এমন আবর্জনা নেয়া বন্ধ করা।

তিনি আফগান শরণার্থীদের প্রতিও একই ধরনের ক্ষোভ দেখিয়েছেন এবং তার প্রশাসন ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করেছে।

এই বক্তব্যগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ ট্রাম্প প্রায়ই একজন সম্ভাব্য স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করেন বলে সমালোচনা রয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, স্বৈরশাসকরা প্রায়ই দুর্বল সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নিজেদের পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করে।

মিনেসোটায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখায়, কীভাবে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে দোষারোপ করা বৃহত্তর সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে একটি অভিবাসনবিরোধী অভিযান চালায়।

কারণ সেখানে সোমালি সম্প্রদায়কে ঘিরে একটি সরকারি জালিয়াতির কেলেঙ্কারি ঘটে। প্রেসিডেন্ট পুরো সম্প্রদায়কেই অন্যায়ভাবে দোষারোপ করেন।

এর ফলে অভিযান চলাকালে বহু মানুষ- মুসলিম ও অমুসলিম, অভিবাসী ও নাগরিক- নির্যাতনের শিকার হয় এবং দুই বিক্ষোভকারী রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হন।

মুসলিমবিদ্বেষ নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলছে। শরিয়াহ- যা মূলত কোরআনভিত্তিক নীতিমালা, তা নিয়ে অযৌক্তিক ভয় ছড়ানো হচ্ছে।

টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট সম্প্রতি একটি আইন স্বাক্ষর করেছেন, যার লক্ষ্য তথাকথিত শরিয়াহ কম্পাউন্ড বন্ধ করা। অর্থাৎ এটা এমন সম্প্রদায় যেখানে নাকি শুধু মুসলমানরা থাকে এবং ধর্মীয় আইন অনুসারে চলে।

টেক্সাসের প্রতিনিধি চিপ রয় প্রিজার্ভিং আ শরিয়াহ-ফ্রি আমেরিকা অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। সিনেটর জন করনিন সহ-উদ্যোগ নিয়েছেন আরেকটি বিলে। তাহলো ‘ডিফিট শরিয়াহ ল ইন আমেরিকা অ্যাক্ট।

এদিকে র‌্যান্ডি ফাইন প্রস্তাব করেছেন প্রোটেক্টিং পাপিস ফ্রম শরিয়াহ অ্যাক্ট। এই প্রচেষ্টাগুলো মূলত সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শরিয়াহর চরম সংস্করণ কিছু দেশে সমস্যা তৈরি করেছে- যেমন আফগানিস্তান ও ইরান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এটি কোনো হুমকি নয়।

মুস্তাফা আকিওল ক্যাটো ইনস্টিটিউট-এর সঙ্গে যুক্ত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এসব প্রস্তাব অতীতের ক্যাথলিক ও মরমনবিরোধী আইনের অনুকরণ মাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাখ লাখ মুসলমান অন্য সবার মতোই আমেরিকান। তারা কর দেন, ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং সেনাবাহিনীতে কাজ করেন। অনেক পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করছে।

অন্যরা নতুন জীবন শুরু করতে সেখানে গেছেন আংশিকভাবে। কারণ দেশটির সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। কিন্তু মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ার ফলে তাদের অনেকেই নিজ দেশেই নিরাপত্তাহীন বোধ করছেন। কেউ কেউ মসজিদে যেতে বা ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন।

টেক্সাসের প্লানো শহরের সামাজিক সেবা সংগঠন পিস ইন দ্য হোম ফ্যামিলি সার্ভিসেসের প্রধান মোনা কাফিল বলেন, আমরা আমাদের শিকড়, বাড়ি এবং প্রজন্মের গল্প ছেড়ে এমন একটি দেশে এসেছিলাম যেখানে মনে করেছিলাম এমন ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু এখন সেই ভয় আবার ফিরে আসছে।

মুসলিমবিদ্বেষ শুধু মুসলমানদেরই ক্ষতি করছে না, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থেরও ক্ষতি করছে। ট্রাম্প বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। দেশটি একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র এবং জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলিম। এই যুদ্ধের পরিকল্পনা অনেকের মতে বেপরোয়া এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেয়া হয়েছে।

রিপাবলিকানদের মুসলিমবিদ্বেষের সঙ্গে এই যুদ্ধ মিলিয়ে দেখলে এটি ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে মনে হতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল করে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে- যেমন সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এই সম্পাদকীয় পাতা একসময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর অনেক নীতির সমালোচনা করেছিল। তবে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্টের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। ১১ সেপ্টেম্বর হামলার ছয় দিন পর তিনি একটি মসজিদে যান এবং মুসলিম নেতাদের পাশে দাঁড়ান।

তিনি বলেন, যখন আমরা ইসলামের কথা ভাবি, তখন আমরা এমন একটি বিশ্বাসের কথা ভাবি যা বিশ্বজুড়ে এক বিলিয়ন মানুষের জীবনে সান্ত্বনা এনে দেয়।

ট্রাম্প ও অন্যান্য রিপাবলিকানদের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ লজ্জাজনক। এতে অসংখ্য মিথ্যা রয়েছে। রাজনীতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সব আমেরিকানের উচিত এই ধরনের ঘৃণার বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ জানানো।

আরও পড়ুন