লন্ডন : সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬ ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

খামেনির সুনির্দিষ্ট অবস্থান যেভাবে শনাক্ত করে সিআইএ ও ইসরাইল

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু


প্রকাশ: ০১/০৩/২০২৬ ০২:৪২:৫৪ অপরাহ্ন

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত যখন চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছিল, ঠিক তার আগমুহূর্তে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করে। তা হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অবস্থান।


অভিযান সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, সিআইএ কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির গতিবিধি এবং অভ্যাসের ওপর নজর রাখছিল।


সংস্থাটি জানতে পারে- শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সরকারি কম্পাউন্ডে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যেখানে খামেনি নিজেও উপস্থিত থাকবেন।


গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের হামলার সময় পরিবর্তন করে। লক্ষ্য ছিল এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং খামেনিকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে যুদ্ধের শুরুতেই একটি বড় বিজয় অর্জন করা।


ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান শনাক্ত করার এই দ্রুত ও নিখুঁত প্রক্রিয়াটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার গভীর গোয়েন্দা সমন্বয়েরই প্রতিফলন। বিশেষ করে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানি নেতৃত্বের ওপর দেশ দুটির গোয়েন্দা নজরদারি অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।


অন্যদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধের স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছিল, সেই চরম উত্তেজনার সময়েও নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইরানি নেতাদের ব্যর্থতা এই অভিযানে ফুটে উঠেছে।


সিআইএ’র দেয়া তথ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির অবস্থান সম্পর্কে ‘হাই ফিডেলিটি’ বা অত্যন্ত নির্ভুল নিশ্চয়তা ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংবেদনশীল সামরিক ও গোয়েন্দা পরিকল্পনার খাতিরে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন।


ইসরাইল এই তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করা একটি অভিযান পরিচালনা করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো।


যদিও শুরুতে অন্ধকারে বা রাতের বেলা হামলার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু শনিবার সকালে তেহরানের সরকারি কম্পাউন্ডে বৈঠকের খবর পেয়ে তারা সময় বদলে নেয়। যেখানে এই বৈঠক হচ্ছিল, সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্সি অফিস, সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দপ্তর অবস্থিত।


ইসরাইলের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, সামরিক পরিষদের প্রধান অ্যাডমিরাল আলী শামখানি এবং আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সৈয়দ মজিদ মুসাভিসহ আরও অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা।


শনিবার ভোরে ইসরাইলের বিমান ঘাঁটিগুলো থেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে। এতে অল্প সংখ্যক বিমান ব্যবহার করা হলেও সেগুলো ছিল দীর্ঘপাল্লার এবং অত্যন্ত নিখুঁত লক্ষ্যভেদী মারণাস্ত্রে সজ্জিত।


উড্ডয়নের ঠিক দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর, তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। হামলার সময় শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা একটি ভবনে এবং খামেনি তার পাশের আরেকটি ভবনে ছিলেন।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর দেখা একটি বার্তায় এক ইসরাইলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা লিখেছেন, আজ সকালে তেহরানের বেশ কয়েকটি স্থানে যুগপৎ হামলা চালানো হয়েছে, যার একটিতে ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়ো হয়েছিলেন।


ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও এই হামলায় ইসরাইল পুরোপুরি ‘ট্যাকটিক্যাল সারপ্রাইজ’ বা কৌশলগত বিস্ময় অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এবং সিআইএ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।


রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, ইসরাইলি হামলায় দুই শীর্ষ সামরিক নেতা- অ্যাডমিরাল শামখানি এবং মেজর জেনারেল পাকপুর নিহত হয়েছেন।


সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় খামেনি এবং আইআরজিসি কীভাবে চাপের মুখে যোগাযোগ এবং চলাচল করে, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাই এবার খামেনির নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করেছে।


শনিবারের এই হামলায় ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ পর্যায় প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। যদিও ইরানের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা বেঁচে গেছেন, তবে পরবর্তী দফায় চালানো হামলাগুলোতে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অবস্থানগুলোকেও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।


আরও পড়ুন