তীব্র গরমে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হজ পালন
তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে সৌদি আরবের মক্কার জলবায়ু ‘মৌলিকভাবে পরিবর্তিত’ হয়েছে। এর ফলে গ্রীষ্মের বাইরের মাসগুলোতেও লাখো হজযাত্রী চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। খবর গার্ডিয়ান।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মে মাসেও এখন নিয়মিত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে।
অতীতে এমন তাপমাত্রা সাধারণত শুধু গ্রীষ্মকালেই হতো। জলবায়ু সংকটের কারণে এখন প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর মে মাসে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মে মাসের গড় তাপমাত্রা আগের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ফলে মে মাসে অনুষ্ঠিত হজ এখন অতীতের গ্রীষ্মকালীন হজের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করায় প্রতিবছর হজের সময় ১০ থেকে ১১ দিন এগিয়ে আসে। ফলে প্রায় ৩৩ বছরের একটি চক্রে হজ সব ঋতুতেই অনুষ্ঠিত হয়। হজ পালনের সময় মুসল্লিদের টানা কয়েক দিন খোলা পরিবেশে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়।
২০২৪ সালে জুন মাসে অনুষ্ঠিত হজে অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে মে মাস অপেক্ষাকৃত শীতল হলেও এখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের সতর্কবার্তা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো না গেলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বছরের প্রায় সব সময়ই বিপজ্জনক তাপমাত্রার মধ্যে হজ পালন করতে হতে পারে।
২০২২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান জলবায়ু নীতির ধারাবাহিকতায় শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেলে মক্কায় অনুষ্ঠিত প্রায় ৯৭ শতাংশ হজই বিপজ্জনক তাপমাত্রার মধ্যে পড়বে।
এদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাপজনিত ঝুঁকি কমাতে ছায়াযুক্ত পথ, কুলিং স্টেশন, মিস্টিং সিস্টেম এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি এই গরমে হজযাত্রীদের হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
তারা বলছেন, নির্ধারিত পরিবহন ব্যবস্থা আপনাকে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলে সহায়তা করে। নির্ধারিত পরিবহন সুবিধা নিন এবং অতিরিক্ত গরমের সময় হাঁটা থেকে বিরত থাকুন।
সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বাইরে বের হলে সঙ্গে ছাতা রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া পরিমিত পানি পান করতেও বলা হয়েছে নির্দেশনায়।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমাতে না পারলে লাখো মুসল্লিকে এমন এক জলবায়ুতে হজ পালন করতে হবে, যা এ ধর্মীয় আচার পালনের জন্য উপযুক্ত নয়।
একই প্রতিষ্ঠানের গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, হজ পালনের জন্য বছরের নিরাপদ সময় ধীরে ধীরে কমে আসছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো অব্যাহত থাকলে সহনীয় তাপমাত্রার সময়সীমা আরও সংকুচিত হবে।
কোপেনহেগেন সেন্টার ফর ডিজাস্টার রিসার্চের গবেষক ইমানুয়েল রাজু বলেন, হজে চরম তাপমাত্রা একটি বিশেষ মানবিক চ্যালেঞ্জ। কয়েক দিন ধরে লাখো মানুষকে খোলা পরিবেশে চলাচল করতে হয়। তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে লাখো মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।