লন্ডন : বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪১ অপরাহ্ন

দেশে আটকে পড়া হাজারো সৌদি প্রবাসীরা চাকরি হারানোর শঙ্কায়

দেশের এয়ারপোর্টে প্রবাসীরা পৌছেছেন

দেশের এয়ারপোর্টে প্রবাসীরা পৌছেছেন


প্রকাশ: ১৪/১০/২০২৬ ০৭:১৯:৫৯ অপরাহ্ন

দেশে ছুটিতে দেশে আসা এবং নতুন ভিসায় যেতে না পারা হাজারো কর্মীর চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

হুথিদের হামলার জেরে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। 

একদিকে চাকরি হারানোর ভয়, আরেকদিকে পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আতঙ্ক – দুই মিলিয়ে তারা এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। এই সংকটের সমাধান কোথায় তাও কেউ জানেন না।

কেন এই সংকট?

কয়েক দিন আগে রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আকাশ যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এর জেরে ঢাকা থেকে সৌদি আরবগামী অন্তত ১০০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

এতে দেশে আটকা পড়েছেন ১৫ হাজার বেশি বাংলাদেশি যাত্রী। তাদের মধ্যে অধিকাংশই সৌদি আরবে কাজের উদ্দেশ্যে যাবেন বলে জানা গেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে অনেকেই জানতে পারছেন তাদের ফ্লাইট ছাড়বে না।

চাকরি হারানোর আতঙ্ক

প্রবাসী কর্মীদের সবচেয়ে বড় শঙ্কা চাকরি নিয়ে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে অনেকেরই চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ৭ বছর ধরে সৌদির রিয়াদে রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন রফিকুল। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ১২ অক্টোবর তার জেদ্দার ফ্লাইট ছিল।

তিনি বলেন,বিমানবন্দরে এসে শুনি ফ্লাইট স্থগিত। আমার ছুটি গতকালই (১১ অক্টোবর) শেষ হয়েছে। কফিলকে ফোন দিয়েছিলাম, সে বলেছে তিন দিনের মধ্যে না ঢুকলে অন্য লোক নিয়ে নেবে। আমার ২ ছেলে, মা অসুস্থ। এই চাকরিটা গেলে পুরো পরিবার পথে বসবে।

তার ভিসার এক্সিট-রি-এন্ট্রি’র মেয়াদ আছে আর মাত্র ৯ দিন। তিনি বলেন,আমাকে যে কোনও মূল্যে সৌদি আরব যেতে হবে। সময়মতো যেতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না।

প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের দাম্মামে একটি কোম্পানিতে ক্লিনার হিসেবে যাওয়ার কথা ছিল আবুলের। দালাল ও এজেন্সিকে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে ভিসা করেছেন। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) শাহজালাল বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে তিনি ১১ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন।

তিনি বলেন, গ্রামের জমি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেছি। ভিসায় লেখা ১৫ অক্টোবরের মধ্যে কোম্পানিতে জয়েন করতে হবে, না হলে ভিসা অটো ক্যানসেল। এখন ফ্লাইট কবে হবে জানি না, এজেন্সি ফোনও ধরছে না।

তার মতো নতুন কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ সৌদিতে এখন ‘তাকামুল’ পরীক্ষায় পাস না করলে কাজে যোগ দেওয়া যায় না।

প্রবাসীদের আশঙ্কা, যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ায় ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অনেকের এক সপ্তাহের মধ্যে না ফিরলে ভিসা বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। 

এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ না দিলে নিয়োগকর্তারা (কফিল) অন্য কর্মী নিয়োগ করতে পারেন বা চুক্তি বাতিল করতে পারেন। পাশাপাশি টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অতিরিক্ত যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ কে বহন করবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছেন যাত্রীরা।

শ্রমবাজারে বড় ধাক্কার শঙ্কা

বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বহুমুখী সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরীর হিসাবে প্রতিবছর অন্তত ৮ লাখ বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। 

এই প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা এলে নতুন অভিবাসী কর্মীদের পাশাপাশি তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিমান সংস্থাগুলো যাত্রীদের নিকটস্থ বিক্রয় কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে বলেছে। তবে কবে ফ্লাইট স্বাভাবিক হবে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো মেলেনি।

সোহেল ছুটিতে দেশে এসে এখন যেতে পারছেন না। এদিকে সৌদিতে তার আকামার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০ অক্টোবর। 

তিনি বলেন,আমি না গেলে আকামা রিনিউ হবে না। আকামা রিনিউ না হলে আমার বউ-বাচ্চার ভিসা হবে না। এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আমাদের চার জনের ভবিষ্যৎ আটকে গেছে। প্রতিদিন হোটেল ভাড়া আর খাওয়ার পেছনে ২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

বরিশালের সৌদি প্রবাসী হাবিল খান। রিয়াদগামী যাত্রী। আবুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে তার যাওয়ার কথা। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে তিনি যেতে পারছেন না। বিমানবন্দরে কথা হয় তার সঙ্গে। 

তিনি বলেন, আমার ভিসার মেয়াদ আর মাত্র তিন দিন আছে। ২১ তারিখ পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিল আছে। আমি এখন কীভাবে যাবো।

তিনি বলেন, আমি চেষ্টা করছি টিকিট চেঞ্জ করতে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছুটি বাড়ানো কিংবা ভিসার মেয়াদ বাড়ানো এখান থেকে সম্ভব না। যেকোনও মূল্যে আমাকে সৌদি আরবে যেতে হবে।

আটকে পড়া সৌদি প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তবে এ আলোচনার জন্য পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে তারা যেন কর্মস্থলে ফিরতে পারে, সে ব্যবস্থাটা করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত রবিবার যে ঘটনাটা ঘটলো, সে ঘটনার পর থেকে আমাদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে। 

মূলত সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ এসব ক্ষেত্রে সব সময় আন্তরিক। এখন যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তাদের বিষয় বিগত দিনের মতোই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই একটা সমাধানের ব্যবস্থার চেষ্টা চলছে। যাতে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে তারা আবার কর্মসংস্থানে ফিরতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিরা চাকরি হারানো ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু প্রবাসী কর্মসংস্থান হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে, অনেকে কর্মহীন অবস্থায় ওই অঞ্চলে রয়েছেন।

শুধু সৌদি আরবেই ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলমান সংঘাত বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ ও বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে বলেও জানান তিনি।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, বহু বছর ধরে কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্য এবং মূলত সৌদিনির্ভর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কর্মী পাঠানো কমছে। কর্মীরা যেমন যেতে পারছেন না, যারা দেশটিতে আছেন, তারাও হতাহত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি যে খুব সহসা স্বাভাবিক হবে, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ, এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও। কারণটা যদি দেখি, দুবাই বহু বছর ধরে একটা ‘সেফ জোন’ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এসেছে, বিনিয়োগ করেছে। সৌদিসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি বিনিয়োগের জোয়ার এসেছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ প্রমাণ করে দিলো, আসলে তারা নিরাপদ না। ফলে অনেক বিনিয়োগ চলে যাবে। 

পর্যটন বলেন, রেস্টুরেন্ট বলেন, নির্মাণ খাত বলেন— সব খাতেই ধস নামবে। আর যেহেতু এই খাতগুলো কমে যাবে, আল্টিমেটলি এর ইমপ্যাক্টটা গিয়ে পড়বে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর। তাদের কাজ কমবে, বেতন কমবে, ছাঁটাই বাড়বে। তাই ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য যে আগের মতো বড় শ্রমবাজার হিসেবে থাকবে, সেই সম্ভাবনা খুবই কম।

আরও পড়ুন