লন্ডন : শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬ ১২:০৩ অপরাহ্ন

সিদ্ধান্তহীনতায় ৫ ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির

সিদ্ধান্তহীনতায় ৫ ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির

সিদ্ধান্তহীনতায় ৫ ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির


প্রকাশ: ০১/০৫/২০২৬ ১০:৪৩:০০ পূর্বাহ্ন

শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে স্থিতিশীলতা ফেরানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, নতুন রেজ্যুলুশন আইনের পর তা এখন সিদ্ধান্তহীনতার জালে আটকে পড়েছে। একদিকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব।

 অন্যদিকে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভিন্নমত পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে আমানতকারীদের মধ্যেও বাড়ছে দুশ্চিন্তা। এমন পরিস্থিতিতে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে কিনা, তা নিয়ে পরিষ্কার বার্তা চেয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রশাসকরা।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক হলো-এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। 

আর অন্য চারটি ছিল বিতর্কিত চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এতে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থও ফেরত দিতে পারছে না।

এমন অবস্থায় গত বছরের মে মাসে ‘ব্যাংক রেজ্যুলুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আওতায় ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। 

প্রাথমিকভাবে এই উদ্যোগে কিছুটা আস্থা ফিরলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে স্থবিরতা দেখা দেয়। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হলেও চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন। নিয়োগ পাওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। 

নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে ব্যাংকটির কার্যক্রমে গতি আসছে না। 

এর পাশাপাশি শাখা পুনর্বিন্যাস, ব্যয় কমাতে অপ্রয়োজনীয় শাখা বন্ধ এবং একক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রমও থেমে আছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই গত এপ্রিলে সংশোধিত ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন-২০২৬ (১৮-ক ধারা যুক্ত করে) পাসের মাধ্যমে আগের মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখায় একীভূত ৫ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। 

এতে আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং ব্যাংকগুলো থেকে টাকা তোলার চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রশাসকরা বলছেন, নতুন সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ায় তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। 

এরই মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আলাদা হওয়ার আবেদন নতুন আলোচনায় জন্ম দিয়েছে। আলাদা হতে এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকেও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। শিগগিরই তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।

এই পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ বিষয়ে সরকারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। 

এ বিষয়ে গত শনিবার অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় গভর্নর বলেন, ব্যাংক রেজ্যুলুশন বিল পাস হওয়ার পর এই পাঁচটি ব্যাংকের বিষয়ে আমরা ইতিবাচক ও নেতিবাচক-দুভাবেই দেখতে পারি। 

এখন হয় করদাতাদের টাকা থেকে পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের পাওনা এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে, যা কয়েক বছর লাগতে পারে। না হয় একটা নির্দিষ্ট সময় পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রি-ক্যাপিটালাইজড করতে হবে।

জানা গেছে, সংশোধিক ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন পাসের পর আগের মালিকদের হাতে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যাংকগুলোতে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর তারল্যের ওপর। 

নতুন আমানত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, বরং পুরনো গ্রাহকরা তাদের অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেকেই আগের ‘হেয়ারকাট’ মেনে কেবল মূল টাকা ফেরত চাইছেন। একই সঙ্গে ঋণ আদায়ের গতি কমে যাওয়ায় সংকট আরও বাড়ছে। 

গত রবিববার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক বৈঠকে ব্যাংকগুলোতে দায়িত্বরত প্রশাসকরা এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তারা গভর্নরের কাছে জানতে চেয়েছেন, সরকার কি একীভূত কাঠামো ধরে রাখবে, নাকি পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ তৈরি করবে। 

এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দিকনির্দেশনা দেননি গভর্নর। তিনি কেবল বলেছেন, যখন যে পরিস্থিতি আসবে, তা মোকাবিলা করতে হবে।

কয়েকজন প্রশাসক আমাদের সময়কে জানান, আমরা মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে নির্দেশনা ছিল, তার ভিত্তিতেই কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু নতুন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত একীভূত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা পাইনি। 

ফলে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, কেবল রুটিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে আইন সংশোধনের মাধ্যমে আগের মালিকদের ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। 

গ্রাহকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন ব্যাংকগুলো আসলে কোন পথে যাচ্ছে, সেটি তারা বুঝতে পারছেন না। শরিফ হোসেন নামের একজন আমানতকারী বলেন, ব্যাংকগুলো একীভূত করার খবর শুনে একটু ভরসা পেয়েছিলাম। এখন পুরনো মালিকদের কাছে ফেরার কথা শুনে ভয় লাগছে। আমরা অন্তত আমাদের জমা টাকা নিরাপদে ফেরত চাই।

এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করার আগ্রহ প্রকাশ করে গত সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছেন স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও উদ্যোক্তারা। আবেদনে তারা একটি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তুলে ধরে বিকল্প তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন। 

এর মধ্যে আছে ব্যাংকটিকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরদার করা এবং প্রশাসক-নির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে বোর্ড-চালিত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ নিলে আমানতকারীদের সুরক্ষা বজায় রেখে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। 

যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও উদ্যোক্তা পরিচালক মেজর (অব.) ডা. মো. রেজাউল হক আমাদের সময়কে বলেন, সংশোধিত ব্যাংক রেজ্যুলুশন কাঠামোর মধ্যে যে সুযোগ রাখা হয়েছে, সেই বিধান অনুযায়ীই তারা আবেদন করেছেন। তারা আশা করছেন, এই আবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংকটিকে আবার স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন