ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি লন্ডনে বিলাসবহুল বাড়ি কেনার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করেন, তার একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে এসেছিল এমন একটি কোম্পানি থেকে যার মালিক ব্রিটিশ-ইসরাইলি ব্যবসায়ীরা।
এ তথ্য উঠে এসেছে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ওয়াইনেট নিউজ। এটা তদন্ত করেছে ইসরাইলি ওয়াচডগ মিডিয়া শোমরিম এবং আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আৃইসিআইজে)।
তদন্তে জানা যায়, ২০১৩ সালে ৩ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের একটি ঋণ দেয়া হয় একটি কোম্পানিকে, যা নিবন্ধিত ছিল আইল অব ম্যান-এ- যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত একটি ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে।
সে সময় এই লেনদেনে জড়িত কোনো ইরানি নাগরিকের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল না এবং আইনি দিক থেকেও এই ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না।
তবে সমালোচকদের মতে, ইসরাইলি মালিকানাধীন একটি কোম্পানি থেকে অর্থ নেয়ার ঘটনা ইরানি সরকারের দীর্ঘদিনের ইসরাইলবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে এক ধরনের দ্বিচারিতা প্রকাশ করে।
প্রায় দুই মাস আগে বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগে এবং খামেনির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের আগেই সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ মোজতবা খামেনির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে একটি বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সেই প্রতিবেদনে গোপন ব্যবসায়িক নথি, সম্পত্তির রেকর্ড এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বলা হয়- মোজতবা খামেনি কিছু বছরে ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ২০১৯ সালে তার ওপর আরোপিত ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে বিলিয়ন ডলার পশ্চিমা দেশগুলোতে স্থানান্তর করতে সক্ষম হন।
এই অর্থের উৎস ছিল ইরানি তেল বিক্রি। পরে তা শেল কোম্পানির জাল এবং ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড, লিখটেনস্টাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অসংখ্য ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করা হয়।
এই অর্থের একটি অংশ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছে যায়। যার মধ্যে খামেনি পরিবারও ছিল। সেই অর্থ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সম্পত্তি কেনা হয়।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নেটওয়ার্কের মূল ব্যক্তি ছিলেন আলি আনসারি, ৫৭ বছর বয়সী এক ইরানি ব্যবসায়ী। তার সাইপ্রাসের নাগরিকত্বও রয়েছে। এই অতিরিক্ত নাগরিকত্বের কারণে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সহজেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে এবং কোম্পানি নিবন্ধন করতে পেরেছিলেন।
আনসারি ১৯৮০-এর দশক থেকে মোজতবা খামেনিকে চিনতেন এবং ইউরোপে খামেনি পরিবারের প্রধান প্রতিনিধি বা প্রক্সি হিসেবে কাজ করতেন। তিনি রিয়েল এস্টেট কেনাবেচার কাজও পরিচালনা করতেন।
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনে মোজতবা খামেনির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১২টিরও বেশি সম্পত্তি, যার মোট মূল্য প্রায় ১২ কোটি ডলার। এর মধ্যে রয়েছে ৪ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি ভিলা, জার্মানিতে দুটি হোটেলের অংশীদারিত্ব, স্পেনের মায়োরকা দ্বীপে একটি বিলাসবহুল গলফ রিসোর্ট, প্যারিসে কয়েকটি সম্পত্তি, দুবাইয়ের বেভারলি হিলস জেলাতে একটি বিলাসবহুল ভিলা।
আনসারির এই কার্যক্রম প্রায় দেড় দশক ধরে চললেও গত অক্টোবর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। তাকে তখন বলা হয় ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ইরানি ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী’, যিনি আইআরজিসিকে অর্থায়ন করেছেন। তার সম্পদও জব্দ করা হয়। আনসারি অবশ্য ব্লুমবার্গের অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন তার সঙ্গে খামেনির কোনো সম্পর্ক নেই।
শোমরিম ও আইসিআইজের নতুন তদন্তে এখন বেরিয়ে এসেছে সেই বড় সম্পত্তি কেনার অর্থায়নের উৎস। ২০১৩ সালে বার্চ ভেঞ্চার্স নামে একটি শেল কোম্পানি- যা আইল অব ম্যান-এ নিবন্ধিত, তা লন্ডনের বিশপস অ্যাভিনিউ এলাকায় সম্পত্তি কিনতে ৩ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড ঋণ নেয়।
এই এলাকাটি ‘বিলিয়নিয়ার্স রো’ নামে পরিচিত। মোট প্রায় ২০ ডুনাম (প্রায় পাঁচ একর) জমির ওপর এই সম্পত্তি কেনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঋণ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়, যাতে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা ঢেকে দেয়া যায়।
নথি অনুযায়ী, ঋণটি দেয়া হয়েছিল একটি ব্রিটিশ বিনিয়োগ তহবিলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এলজে পার্টনারশিপের মাধ্যমে। কিন্তু প্রকৃত অর্থ এসেছিল আরেকটি কোম্পানি থেকে। সেটা হলো টপল্যান্ড জুপিটার লিমিটেড।
পরে টপল্যান্ড এই ঋণকে একটি সফল বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে। তবে সেখানে আইল অব ম্যান কোম্পানির নাম উল্লেখ করা হয়নি; বলা হয়েছিল ঋণটি দেয়া হয়েছে এলজে পার্টনারশিপকে।
নথিতে দেখা যায়, ঋণের গ্যারান্টি নথিতে টপল্যান্ডের নাম স্পষ্টভাবে ছিল এবং জামানত হিসেবে লন্ডনের ১২টি বাড়ি বন্ধক রাখা হয়েছিল। ঋণটি প্রায় দুই বছর পর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুরোপুরি পরিশোধ করা হয়।
অতিরিক্ত নথিতে দেখা যায়, এলজে পার্টনারশিপ এবং আলি আনসারির মধ্যে সম্পর্ক পরেও বজায় ছিল। ২০১৮ সালে এলজে আবারও আনসারির সঙ্গে যুক্ত আরেকটি কোম্পানি জিবা লেজারকে একটি ঋণ দেয়, যেখানে একই লন্ডনের সম্পত্তিগুলো জামানত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ঋণের প্রকৃত অর্থদাতা টপল্যান্ড জুপিটার আসলে টপল্যান্ড গ্রুপ-এর অংশ। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসরাইলে জন্ম দুই ব্যবসায়ী ভাই সল জাকাই এবং এডি জাকাই। তারা মূলত ইসরাইলের রামাত গান শহরের বাসিন্দা।
ইসরাইলি অর্থনৈতিক পত্রিকা দ্য মার্কারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়- সল জাকাই ১৯৭০-এর দশকে লন্ডনে যান এবং প্রায় দুর্ঘটনাবশত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় প্রবেশ করেন। তিনি একবার ৪০ হাজার পাউন্ডে একটি গুদামঘর কিনে তিন সপ্তাহ পরে ১ লাখ পাউন্ডে বিক্রি করেন।
সেখান থেকেই তাদের ব্যবসার বিস্তার শুরু হয়। দুই ভাই মিলে পরে টপল্যান্ডকে ব্রিটেনের অন্যতম বড় রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। তারা অর্থনৈতিক মন্দার সময় বড় বড় সম্পদ কিনে নেয়ার কৌশলের জন্য পরিচিত ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের সম্পত্তি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারে, টেসকোর সম্পদ প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারে কেনা হয়েছিল।
২০০৯ সালে ব্রিটেন বিদেশি আয়ের ওপর ৫০ শতাংশ কর আরোপের নীতি চালু করলে সল জাকাই লন্ডন ছেড়ে ইসরাইল ও জিব্রাল্টারে চলে যান। সে সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড।
সহকর্মীরা তাকে বলতেন- তিনি নাকি সম্পত্তি বিক্রি ও ঋণ পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ‘টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছেন।’ পরে জানা যায়, তিনি ইসরাইলও ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
২০২৫ সালে সানডে টাইমস তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করে। এই দুই ভাই সাধারণত মিডিয়ার সামনে আসেন না। তারা বিভিন্ন ইহুদি ও ইসরাইলি মানবিক সংগঠনে অনুদান দিয়েছেন।
যেমন ২০১৮ সালে সল জাকাই ছিলেন জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ডের ব্রিটিশ শাখার পৃষ্ঠপোষক। ২০২৩ সালে দুই ভাই হলোকাস্ট থেকে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সম্মানে একটি মধ্যাহ্নভোজ আয়োজন করেন।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত এলজে গ্রুপ পরে কয়েকবার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায় এবং এখন এটি এআইটিআই নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের অংশ।
শোমরিমের প্রশ্নের জবাবে কোম্পানিটি জানায়- এই বিষয়টি এলজে পার্টনারশিপের পুরোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা আলভারিয়াম এবং পরে এএলটিআই টাইডেম্যান গ্লোবাল প্রতিষ্ঠার আগের ঘটনা।
বর্তমান কোম্পানি এসব পুরোনো কার্যক্রমের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নয়। অন্যদিকে টপল্যান্ড গ্রুপ এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।