প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায়ের আবেগ
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের উলুধ্বনি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। কারও চোখেমুখে উৎসবের আনন্দ, কারও মধ্যে প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগ।
শোভাযাত্রার পর নৌকায় প্রতিমা তুলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন বুড়িগঙ্গার দিকে। নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার সদরঘাট-সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীর বিসর্জন ঘাটে এমনই দৃশ্য দেখা যায়। একের পর এক মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে আসছেন ভক্তরা। ঢাকের তালে তালে নদীর ঘাটে পৌঁছে চলছে বিসর্জনের প্রস্তুতি।
কেউ শেষবারের মতো দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি তুলে রাখছেন স্মৃতি হিসেবে।
বিসর্জন ঘিরে উৎসবের আবহ থাকলেও নদী ও আশপাশের সড়কে ছিল বাড়তি সতর্কতা। প্রতিমা বহনকারী নৌযান চলাচল, ঘাটে মানুষের ভিড় এবং সড়কে শোভাযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
রাত ১০টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত ৫৫টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার তথ্য জানায় বিসর্জন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ। তাদের হিসাবে, গতবারের তুলনায় এবার ঢাকা মহানগরে এক হাজারের বেশি প্রতিমা বিসর্জন হতে পারে। রাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে।
বিসর্জন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে সদরঘাট এলাকায় একসঙ্গে তিনটি ঘাট দিয়ে প্রতিমা নিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ১৬টি নৌযানে পর্যায়ক্রমে প্রতিমা বিসর্জনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতি মিনিটে তিনটি প্রতিমা বিসর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিটি নৌকায় সর্বোচ্চ ১২ জনকে ওঠার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর কোতোয়ালি থানা বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিসর্জন ঘাটে ভিড় ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিমা প্রবেশ এবং নৌযানে ওঠানামার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে যারা সাঁতার জানেন না, তাদের নৌকায় না ওঠার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সদস্য বাপ্পী নন্দী বলেন, বিকেলে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রার সময় এক দফা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এরপর আশপাশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা ঘাটে আসছেন। প্রতিটি পূজা কমিটি যাতে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিমা বিসর্জন দিতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিসর্জনের ক্ষেত্রে আমরা নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। যারা সাঁতার জানেন না, তাদের নৌকায় উঠতে নিষেধ করছি। এক দিক দিয়ে প্রবেশ করে অন্য ঘাট দিয়ে বের হওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরাও ভক্তদের সহযোগিতা করছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, বিসর্জন ঘাটের আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কিছুক্ষণ পরপর নদীতে টহল দিচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর নৌযান। ঘাটে প্রতিমা নিয়ে আসা, নৌকায় ওঠা এবং বিসর্জন শেষে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুলিশ, নৌ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, এসআরবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। আশপাশের সড়কেও ছিল পুলিশের টহল। প্রতিমা বহনকারী শোভাযাত্রাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল।
সদরঘাট নৌ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রব বলেন, প্রতিমা বিসর্জন কেন্দ্র করে নদীপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এজন্য ওয়াটার বোর্ড ও স্পিডবোট নিয়ে নৌ পুলিশ সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। বিসর্জন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত নদীতে নিরাপত্তা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। বিকেল ৩টার আগেই কয়েকটি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা পর্যায়ক্রমে ঘাটে আসতে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে ঘাট ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার পাশাপাশি যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা যাওয়ার সময় সড়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিসর্জনস্থলে মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ও ট্রাফিক সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
বুড়িগঙ্গার ঘাটে উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যেও বারবার চোখে পড়ছিল বিদায়ের মুহূর্তগুলো। প্রতিমা নৌকায় তোলার আগে অনেকে প্রণাম করছেন, কেউ হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকছেন কিছুক্ষণ। বিসর্জনের পর খালি হাতে ঘাটে ফিরছেন ভক্তরা। তবে সেই বিদায়ের মধ্যেও রয়েছে আগামী শরতে আবার দেবীকে বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা।
প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নেওয়া ভক্ত সুমন সাহা জাগো নিউজকে বলেন, বিসর্জনের মুহূর্তে আনন্দের পাশাপাশি মন খারাপও হয়। কয়েক দিনের পূজা, পরিবারের সবাইকে নিয়ে মণ্ডপে যাওয়া, প্রার্থনা আর উৎসবের স্মৃতি নিয়ে আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে হবে। তবে দেবীকে বিদায় জানানোর মধ্যেই আগামী বছর আবার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে।
পরিবারের সঙ্গে বিসর্জনে আসা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্পিতা দাস জাগো নিউজকে বলেন, পরিবারের সবার সঙ্গে বিসর্জনে অংশ নেওয়া তাদের কাছে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি আবেগেরও বিষয়। প্রতিমা বিসর্জনের সময় মন খারাপ হলেও সবার নিরাপদে বাড়ি ফেরা এবং আগামী বছর আবার একসঙ্গে পূজা উদযাপনের প্রত্যাশাই বড় হয়ে ওঠে।
সূত্রাপুরের স্থানীয় বাসিন্দা অনির্বাণ দে বলেন, দুর্গাপূজার কয়েকটা দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দে কাটে। বিসর্জনের সময় মনটা কিছুটা খারাপ হয়ে যায়, কারণ আবার একটি বছরের অপেক্ষা শুরু হয়। তবে এই বিদায়ের মধ্যেই আগামী বছর আবার দেবীকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দ ও প্রত্যাশা রয়েছে। সবাই মিলে শান্তিপূর্ণভাবে বিসর্জন দিতে পারছি, এটাই ভালো লাগছে।
এদিকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুড়িগঙ্গার ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের সারি দীর্ঘ হচ্ছিল। ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে একে একে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছিল প্রতিমা। ঘাটের পাশেই প্রতিবেদনটি লেখার সময়ও দূর থেকে ভেসে আসছিল ঢাকের শব্দ। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় মঞ্চ থেকে ভেসে আসছিল স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন ঘোষণা।
সব মিলিয়ে রাতের বুড়িগঙ্গায় তখনো বিরাজ করছিল উৎসবের আবহ। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছিল দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। তবে ঘাট থেকে ফিরে যাওয়া মানুষের মনে রয়ে যাচ্ছিল পূজার স্মৃতি, বিদায়ের আবেগ আর আগামী বছর আবার দেবীকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষা।