জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, ঢাকা
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম শুধুমাত্র জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান নয়; বরং বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অসংখ্য পালাবদলেরও নীরব সাক্ষী।
এই মসজিদের মিম্বর থেকে সাপ্তাহিক জুমআর খুৎবার পাশাপাশি সময়ে সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র, জনজীবন, আইন-আদালত, এমনকি রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে স্পষ্ঠ বক্তব্য এসেছে।
অতীতে এর মিম্বর থেকে যেমনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি কঠিন হুংকার দেওয়া হয়েছিল আবার একই সাথে এর মিম্বর থেকে রাষ্ট্রীয় সমঝোতার বহু নজীরও আছে।
ফলে দেখা গিয়েছে যে জাতীয় মসজিদের খতিবের পদ কখনো নিছক একজন ইমামের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই পদে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের ব্যক্তিত্ব, পাণ্ডিত্য, জনগ্রহণযোগ্যতা ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মিলে জাতীয় পরিসরে মিম্বরের প্রভাব একেক সময় একেক মাত্রা পেয়েছে।
জ্ঞাননির্ভর সূচনা
পাকিস্তান আমলে বাইতুল মুকাররম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতিমান পণ্ডিত মাওলানা আবদুর রহমান কাশগরীকে প্রথম খতিব নিয়োগের মধ্য দিয়ে এই পদের যাত্রা শুরু হয়।
জানা যায়, ১৯৭১ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কারি উসমান মাদানী ভারপ্রাপ্ত খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ ছিল খুবই স্বল্পকালীন।
এরপর খতিব হন হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরের বিখ্যাত পণ্ডিত মুফতি সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান বারকতী। ১৯৭৪ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনিও এ পদে ছিলেন।
এরপর খতিব পদে দায়িত্ব পান মুফতি আবদুল মুইজ যিনি তিনি শিক্ষা, অধ্যয়ন ও গবেষণা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মনোযোগী থাকতেই বেশী পছন্দ করতেন, ফলে কখনই স্বশরীরে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা হয়ে ওঠেনি।
তবে পারিবারিক সূত্রে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। এবং মুসলিম লীগের রাজনীতি ও পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করতেন।
প্রথম পর্বের এই চারজন খতিবদের দিকে তাকালে সহজে বোঝা যায় যে তখন মিম্বরের কর্তৃত্বের মূল উৎস ছিল ইলম ও আমল। তাদের প্রত্যেকের জ্ঞান, প্রতিভা, ইলম ও আমল, প্রভাব বায়তুল মোকাররমের মিম্বরকে জ্ঞান ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। সে সময় মিম্বরের প্রাণশক্তি হয়ে উঠে মূলত খতিবদের জ্ঞান, ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা ও সমাজে তাঁর মর্যাদা।
উবায়দুল হক: জনপরিসরের কণ্ঠ
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র ও সমাজের নানা সংকট, রাজনৈতিক মেরুকরণ, বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের রূপান্তর এবং জনজীবনে ইসলামি নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান ভূমিকায় মিম্বরের সামাজিক অর্থ বদলে দেয় এবং বায়তুল মোকাররমকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক মাওলানা উবায়দুল হক।
১৯৮৪ সালে দায়িত্ব নিয়ে ২০০৭ সালের ৬ অক্টোবর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ২৩ বছর তিনি খতিব ছিলেন, যা এই পদে দীর্ঘতম মেয়াদ। এই ধারাবাহিকতা তাঁকে শুধুমাত্র জাতীয় মসজিদের খতিব নয়, দেশের ধর্মীয় জনপরিসরের অন্যতম সাহসি ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
তাঁর সাপ্তাহিক জুমআর খুৎবায় ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার পাশাপাশি জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও সামাজিক নানা প্রশ্ন জায়গা পেত। ফলে তাঁর বক্তব্য মসজিদের চার দেয়ালে আটকে না থেকে সংবাদপত্রে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানান প্রতিক্রিয়া দেখা যেত।
যদিও তাঁর প্রভাবকে দলীয় রাজনীতির মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। জঙ্গিবাদ, সহিংসতা, নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় বিষয়ে আদালতের বিতর্কিত রায়, ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক ঐক্য, ধর্মের নামে অপরাধ কিংবা জাতীয় সংকটের মতো বিষয়েও জাতীয় খতিবের বক্তব্য রাজনৈতিক অভিঘাত যে তৈরি করতে পারে তিনি ছিলেন তার বাস্তব প্রমাণ।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর ভূমিকা সেই বৃহত্তর উদ্যোগের বাস্তব উদাহরণ। কোনো দলের মুখপাত্র না হয়েও মিম্বর তখন জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি যে মিম্বরের রাজনৈতিক প্রভাব মানেই দলীয় রাজনীতি নয়। ন্যায়বিচার, নাগরিক অধিকার, সহিংসতা, যুদ্ধ বা জনস্বার্থের প্রশ্নে একজন ধর্মীয় নেতার অবস্থানও রাজনৈতিক পরিসরে প্রভাব ফেলে। সে হিসেবে তিনি নিজেই ছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান।
তার অনন্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত খতিব পদের রাষ্ট্রীয় চরিত্র। যদিও জাতীয় মসজিদের প্রশাসন ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত; খতিব নিয়োগও হয় সরকারি সিদ্ধান্তে। ফলে খতিব একদিকে জাতীয় ধর্মীয় নেতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ।
কিন্তু এই দ্বৈত পরিচয় তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তোলে। তবে, এক্ষেত্রে একটি বিষয়ের সাথে সবাই কমবেশি একমত হবেন যে বাংলাদেশে ‘খতিব’ নামক শব্দটিকে একমাত্র ওবায়দুল হক সাহেবের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিত পায় এবং তিনি এই চরিত্রের একক আইকনে পরিণত হন।
খতিব উবায়দুল হকের মৃত্যুর পর মুফতি মুহাম্মদ নূরুদ্দীন ২০০৯ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। তবে মুফতি মুহাম্মদ নুরুদ্দীন বাংলাদেশের শরীয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
এক্ষেত্রে তার অবদান অস্বীকার্য। তিনি দেশের অন্যতম প্রধান ব্যাংক ট্রাস্ট ব্যাংকের শরীয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে ট্রাস্ট ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধন ও এর নীতি নির্ধারণী গাইডলাইন তৈরিতে তিনি সভাপতিত্ব করেন।
বিতর্কের সূচনা
২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে, ঢাকা সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে খতিব নিয়োগ দেওয়া হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি স্পষ্ট জানান, জাতীয় মসজিদে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তিনি চান না; মসজিদের শান্ত পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এমন রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে ইমামদের বিরত রাখবেন।
এই ঘোষণা বায়তুল মোকাররমের ইতিহাসে একটি বাঁকবদল। আগে প্রশ্ন ছিল, খতিব জাতীয় জীবনের নানা বিষয়ে কী অবস্থান নেবেন। এবার প্রশ্ন দাঁড়াল, জাতীয় মসজিদের মিম্বরকে কীভাবে দলীয় ও সংঘাতময় রাজনীতির বাইরে রাখা যায়। যদিও অতীতে কখনো দলীয় ও সংঘাতময় রাজনীতির কেন্দ্রে এই মসজিদের ভূমিকা ছিলনা।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল তার জন্য জটিল। তারই নিয়োগের পর খুতবা কে দেবেন, নবনিযুক্ত খতিব না ভারপ্রাপ্ত খতিব, এ নিয়ে টানা কয়েক সপ্তাহ জুমার সময় মসজিদের ভেতরে হট্টগোল, হাতাহাতি ও জুতা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যা জাতীয় দৈনিকগুলোতে ছবিসহ প্রকাশিত হয়।
এমনকি মসজিদের চত্বরে সীরাতুন্নবী (সা) অনুষ্ঠানেও ব্যাপক হট্রগোল হয়। অর্থাৎ মিম্বরকে রাজনীতির বাইরে রাখার ঘোষণা এমন এক পরিস্থিতিতে এসেছিল, যেখানে খতিবের নিয়োগই রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিরোধের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর সালাহউদ্দিন দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সময়ে খতিবের পরিচয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন নিয়োগ ও কর্মকান্ডে ব্যাপক দূর্নীতির পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে সরকারী বেতন-ভাতা গ্রহণ করার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে।
এমনকি তার অনুপস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন যাবত বায়তুল মোকাররমের খতিবের মূল দায়িত্ব ভারপ্রাপ্ত খতিবদের (যেমন মুফতি মিজানুর রহমান) মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল, যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে সাধারণ মুসল্লি ও আলেম সমাজের একটি অংশের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
২০২২ সালে খতিব হন কাওমী ঘরানোর হাদিস, ফিকহ, ইফতা ও মাদ্রাসা পরিচালনায় অভিজ্ঞ মুফতি মুহাম্মদ রুহুল আমীন। কিন্তু তাঁর মেয়াদ দীর্ঘ হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তিনি পালিয়ে যান।
২৯ আগস্ট ধর্ম মন্ত্রণালয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস ড. মুফতি ওয়ালিয়ুর রহমান খানকে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব দেয়। ২০ সেপ্টেম্বর দলবল নিয়ে মুফতি রুহুল আমীন হঠাৎ জুমা পড়াতে ফিরে এলে মসজিদের ভেতরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন।
এর দুই দিন পর, ২২ সেপ্টেম্বর, মন্ত্রণালয় তাঁকে খতিবের পদ থেকে অপসারণ করে। ১৫ বছরের ব্যবধানে দুবার খতিবের পদ ঘিরে জাতীয় মসজিদের ভেতরে হাতাহাতি এই পদের রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতারই সাক্ষ্য দেয়।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সাবেক এই খতিব ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থানায় অবস্থিত গওহারডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মুফতি রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে পৈতৃক সম্পত্তি দখলের অপরাধে ৬ মাসের সাজাও হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মুফতি রুহুল আমিন ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ আখ্যা দিয়ে আলেম-ওলামাদের মাঝে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে নড়াইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা তাকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব পদে নিযুক্ত করেছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট যখন পালিয়ে যান, এই খতিবও তখন আত্মগোপনে চলে যান। তবে কিছুদিন পরে বায়তুল মোকাররমে উপস্থিত হয়ে তিনি নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন- এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও চলমান আছে।
পালাবদলের ধাক্কা
১৭ অক্টোবর ২০২৪ সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনে মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক নতুন খতিব নিযুক্ত হন; পরদিন ধর্ম মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা জানায়। তাঁর নিয়োগ মিম্বরের ইতিহাসে আরেকটি ভিন্ন চরিত্র সামনে আনে। তিনি মূলত গবেষক ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ; হাদিস ও ফিকহ তাঁর বিশেষায়িত ক্ষেত্র।
পাকিস্তানে মুফতি তাকি উসমানীর কাছে ফিকহ অধ্যয়নের পর রিয়াদে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর তত্ত্বাবধানে তিনি হাদিস ও ইসলামি আইন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করেন। বাংলা, আরবি, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় তাঁর ১৬টি গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর তত্ত্বাবধানে গবেষণাধর্মী মাসিক 'আল-কাউসার' প্রকাশিত হয়।
ফলে তাঁর ক্ষেত্রে মিম্বরের শক্তির একটি নতুন রূপ দেখা যায়। খতিব উবায়দুল হকের শক্তি ছিল দীর্ঘ জনপরিচিতি, খুতবার ব্যাপক প্রভাব ও জাতীয় জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতা। খতিব মুফতি মুহাম্মদ নরুদ্দীনের পর থেকে অদ্যবধি জাতীয় মসজিদের খতিবের এই পদ যেন বিতর্কেই ছাড়ছে না।
সেক্ষেত্রে বর্তমান খতিব আবদুল মালেকের শক্তি তুলনামূলকভাবে গবেষণা, হাদিস-ফিকহের পাণ্ডিত্য ও নীতিনিষ্ঠ যুক্তির ওপর। সেখানে তিনি কতটা বিতর্কের উর্ধে থেকে দায়িত্বপালন করবেন—সেটা সময়ের ব্যাপার।
ভাষা বদলেছে, প্রভাব নয়
বায়তুল মোকাররমের ইতিহাসকে "প্রভাব থেকে নীরবতা" এই সহজ অংকে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। ষাট ও সত্তরের দশকে এই মিম্বরের শক্তি ছিল খতিবদের ইলম-আমল ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব।
খতিব উবায়দুল হকের যুগে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যাপক জনগ্রহণযোগ্যতা ও জাতীয় পরিসরে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। খতিব সালাহউদ্দিনের সময়ে সামনে আসে মিম্বরকে দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখার স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ও বিতর্কের সূচনা।
যদিও এই রূপান্তরে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় মসজিদের খতিবকে ধর্মীয় মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জনআস্থার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। সাধারণ মসজিদের ইমাম আর জাতীয় মসজিদের খতিবের বক্তব্যের সামাজিক প্রতিক্রিয়া এক নয়।
বায়তুল মোকাররমের মিম্বর থেকে উচ্চারিত একটি বাক্য মুহূর্তে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে খতিবের সামনে দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে থাকে: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক সত্য উচ্চারণ।
তবে খতিব উবায়দুল হক ও মুফতি আবদুল মালেক দুই সময়ের প্রতিনিধি হলেও আমার দৃষ্টিতে তাঁদের মধ্যে একটি মৌলিক মিল আছে: কেউই জাতীয় মসজিদের মিম্বরকে সমাজবিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক দ্বীপ হিসেবে দেখেননি। পার্থক্য কেবল ভাষায় ও প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতিতে।
মিম্বর এখন এমন এক সূক্ষ্ম সীমারেখায় দাঁড়িয়ে, যেখানে ধর্মীয় বক্তব্য সহজেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থ তৈরি করে; কোনো দলের পক্ষে না গিয়েও খতিবের একটি বক্তব্য রাজনৈতিক আলোচনার গতিপথ বদলে দিতে পারে।
রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক, রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান, দলীয় মেরুকরণ ও নাগরিক সমাজের পরিবর্তন, সবকিছুর ছাপই কোনো না কোনোভাবে এই মিম্বরে পড়েছে। তবে খতিবদের ইতিহাস কয়েকজন আলেমের জীবনী নয়; বাংলাদেশের ধর্মীয় জনপরিসরেরই ইতিহাস।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি জাতীয় মসজিদের মিম্বর কতটা রাজনৈতিক বা কতটা নীরব, তা নয়। প্রশ্ন হলো, জাতীয় মসজিদের মিম্বর তার নৈতিক কর্তৃত্ব কীভাবে ব্যবহার করবে।
দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার না হয়ে, আবার রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে চুপ না থেকে, খতিব কি এমন অবস্থান তৈরি করতে পারবেন, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ব একসঙ্গে জায়গা পায়?
গত ছয় দশকের অভিজ্ঞতা বলে, মিম্বরের প্রভাব কখনো হারিয়ে যায়নি; বদলেছে তার ভাষা। আল্লামা কাশগরী ও মুফতি আমীমুল ইহসানের যুগে সে ভাষা ছিল জ্ঞানের; উবায়দুল হকের সময়ে তা হয়ে ওঠে জনমত ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ; সালাহউদ্দিনের সময়ে সামনে আসে বিতর্কের সূচনা; আর এখন মুফতি আবদুল মালেকের মতো গবেষক আলেমের হাতে মিম্বর আবার জ্ঞান, নৈতিকতা ও সমকালীন সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হবে এটাই প্রত্যাশা।
তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো ক্ষমতা থেকে দূরত্ব বজায় রেখেও সমাজের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব সাহসিকতার সাথে পালন করা। জাতীয় মসজিদের মিম্বরের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকায় নয় বরং; ক্ষমতার ঊর্ধ্বে থেকে মানুষের আস্থা ও নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা।